
হজরত হাজেরা (আ.)-এর জীবনের অবিস্মরণীয় একটি অধ্যায় সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে তাঁর সেই সাতবার ছুটে চলা। তাওয়াক্কুল (নির্ভরতা), ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত এই ঘটনা।
আল্লাহর নির্দেশে ইব্রাহিম (আ.) যখন স্ত্রী হাজেরা ও দুগ্ধপোষ্য পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে নির্জন মরুভূমিতে রেখে যান, তখন সেই স্থান ছিল জনমানবহীন। পাথেয় ফুরিয়ে এলে তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েন শিশুপুত্র ইসমাইল।
কাতর সন্তানের জন্য পানির খোঁজে ব্যাকুল মা হাজেরা সাফা পাহাড় থেকে মারওয়া পাহাড়ে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেন। তাঁর এই অদম্য চেষ্টা ও আত্মনিবেদনের পুরস্কার হিসেবে আল্লাহ জমজম কূপের মাধ্যমে পানির ব্যবস্থা করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৬৪)
হাজেরা (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক ত্যাগ ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার স্মৃতিকে জীবন্ত রাখতেই হজ ও ওমরায় সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সায়ি করা হয়।
সাফা-মারওয়াতে সায়ি করা হজ ও ওমরার অপরিহার্য অংশ। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যারা কাবাঘরে হজ বা ওমরা করে, তাদের জন্য এ দুটিতে প্রদক্ষিণ করাতে কোনো সমস্যা নেই।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৮)
হাদিস শরিফেও সায়ির গুরুত্ব বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে সায়ি করেছেন এবং সাহাবিদেরও তা করার নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ ইবনে খুজাইমা, হাদিস: ২৭৪)
হানাফি মাজহাবে সায়ি করা ওয়াজিব। কেউ এটি ছেড়ে দিলে পশু কোরবানি বা ‘দম’ দেওয়ার মাধ্যমে এর ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। (সহিহুল জামে, হাদিস: ১৭৯৮)
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সাফা-মারওয়াতে সায়ি করা ৭০ জন দাস মুক্ত করার সমতুল্য।’ (ইবনে হিব্বান, হাদিস: ১৮৮৭)
সায়ি করার নির্দিষ্ট সুন্নাহভিত্তিক নিয়ম রয়েছে। সাফা পাহাড় থেকে সায়ি শুরু হয় এবং মারওয়ায় গিয়ে একটি চক্কর পূর্ণ হয়। এভাবে সাফা থেকে মারওয়া এবং মারওয়া থেকে সাফা—মোট সাতবার যাতায়াত করতে হয়। সপ্তম চক্করটি শেষ হয় মারওয়া পাহাড়ে।
সায়ি শুরুর সময় সাফা পাহাড়ে উঠে কাবার দিকে মুখ করে দোয়া করা সুন্নাত। রাসুল (সা.) সাফা পাহাড়ে উঠে কাবার দিকে মুখ করে দীর্ঘ দোয়া করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮)
পুরো সময়জুড়ে আল্লাহর জিকির ও তাসবিহ পাঠ করা উত্তম। পুরুষদের জন্য সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে নির্দিষ্ট দুটি সবুজ চিহ্নের মাঝে দ্রুত চলা বা মধ্যম গতিতে দৌড়ানো (রমল) সুন্নাত।
তবে নারীরা স্বাভাবিকভাবে হেঁটে সায়ি সম্পন্ন করবেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৬৪৪)
সায়ি করার সময় অজু থাকা উত্তম হলেও বাধ্যতামূলক নয়।
সাফা-মারওয়ার সায়ি আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা দেয়—যেকোনো প্রয়োজনে কেবল দোয়ার ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না, পাশাপাশি সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।
হাজেরা (আ.) আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা সত্ত্বেও হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি। এই শিক্ষা আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও প্রাসঙ্গিক। তাওয়াক্কুল মানেই হলো সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর ফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।
বর্তমানে সায়ি করার পথটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত। আধুনিকতার এই সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক অনুভূতি জাগ্রত রাখা জরুরি।
অনেক সময় সায়ি করার সময় মানুষ ছবি তোলা বা ভিডিও করায় মগ্ন হয়ে পড়ে, যা ইবাদতের একাগ্রতা নষ্ট করে। এসব পরিহার করে হজের মূল উদ্দেশ্যের প্রতি মনোযোগী হওয়া উচিত।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।
Published: প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬, ১১: ০০
Source: https://www.prothomalo.com/religion/islam/q5pafeqij1
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!