এই চুক্তিতে বাংলাদেশের রাজস্ব, নীতি-স্বাধীনতা ও দর-কষাকষির ক্ষমতা কমবে; বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত লাভ বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির কারণে বাংলাদেশ রাজস্ব হারাবে, বেশি দরে পণ্য কিনতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ী নীতি ঠিক করতে হবে এবং বাধ্যতামূলকভাবে অসংখ্য শর্ত পালন করতে হবে। বিপরীতে এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বাড়বে, নিজের ভূরাজনৈতিক কৌশল অনুযায়ী বাংলাদেশকে নীতি নিতে বাধ্য করতে পারবে এবং এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে তেমন কোনো ছাড় দিতে হবে না। সব মিলিয়ে এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের লাভ অতি সামান্য, ক্ষতি বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) সই হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে। তখন দায়িত্বে ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার; আর ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠন করা হয়। পরে ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এই পাল্টা বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপ বাতিল করে দেন। এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) আইনের অধীন। এই আইন সাধারণত ব্যবহৃত হয় জরুরি জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায়। যেমন সন্ত্রাসবাদ, নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে। আদালত বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই শুল্ক আরোপে আইনি ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। বাণিজ্য–ঘাটতিকে জাতীয় জরুরি অবস্থা দেখিয়ে শুল্ক বসানো যায় না। শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মূলত কংগ্রেসের। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথমে ১০ শতাংশ এবং পরদিন ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। এটি করা হয় ট্রেড অ্যাক্ট অব ১৯৭৪-এর আওতায়। এই আইনে জরুরি পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে আমদানি পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি শুল্ক বসানো যায়। তবে এরও মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫০ দিন। এরপর কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পারস্পরিক শুল্ক বাতিল করলেও এর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলাদা চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। তবে এটি এখনো কার্যকর হয়নি। এর কারণ হচ্ছে, চুক্তিতে বলা আছে যে দুই পক্ষ নিজেদের আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা লিখিতভাবে জানাবে। এর ৬০ দিন পর চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হবে। তবে চাইলে তারা অন্য তারিখও ঠিক করতে পারবে। অর্থাৎ চুক্তি কার্যকর করতে হলে প্রথমে আইনি প্রক্রিয়া ঠিক করতে হবে। সেটিই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে জাতীয় নির্বাচনের আগে কেন এই চুক্তি করা হলো—এ নিয়েই রয়েছে নানা প্রশ্ন। চুক্তির একতরফা বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। আবার চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই নানা রকম কেনাকাটার চুক্তি করা হচ্ছে। এসব কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এই চুক্তি বাতিলের দাবি তুলছে; আর অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধান হওয়া দরকার। মূল চুক্তির একদম শেষ অনুচ্ছেদ হচ্ছে বাণিজ্যিক নানা বিষয় নিয়ে। এর মূল কথা হচ্ছে কেনাকাটার অঙ্গীকার; আর সেই অঙ্গীকারই দিয়েছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ চুক্তি কার্যকর রাখতে বাংলাদেশ নির্দিষ্ট বেশ কিছু পণ্য কিনতে বাধ্য। চুক্তিতে যেমন বলা হয়েছে— ১. রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশি যাত্রীবাহী বিমান, যন্ত্রাংশ ও সেবা কিনবে। তারা ১৪টি বোয়িং কেনার কথা বলেছে। এর বাইরে আরও কিছু বিমান কেনার সুযোগও রাখবে। ২. বাংলাদেশ বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোকে সাহায্য করবে, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি কিনতে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও (এলএনজি) থাকবে। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি কেনার চুক্তি থাকবে। ১৫ বছরে এর সম্ভাব্য মূল্য ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। ৩. বাংলাদেশ বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোকে সাহায্য করবে, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কিনতে পারে। এর মধ্যে গম, সয়াবিন, য়া থেকে তৈরি পণ্য এবং তুলা থাকবে। গম প্রতিবছর অন্তত সাত লাখ মেট্রিক টন করে পাঁচ বছর কিনতে হবে। সয়াবিন ও সয়া পণ্যের ক্ষেত্রে এক বছরে অন্তত ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার বা ১২৫ কোটি ডলার মূল্যের ২৬ লাখ মেট্রিক টন—যেটি কম হয়, সেটি কিনতে হবে। এসব পণ্যের মোট সম্ভাব্য মূল্য ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি ডলার। ৪. বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম আরও বেশি কিনবে। একই সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা কমাবে। ৫. চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে দেশে কী কী ভর্তুকি দেওয়া হয়, তা বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে জানাবে। চুক্তিতে কৃষি খাতে আগামী পাঁচ বছর প্রতিবছর ৭ লাখ টন গম এবং বছরে ১২৫ কোটি ডলারের সয়াবিন পণ্য বা ২৬ লাখ টন কেনার কথা আছে। এসবের মূল্য বছরে প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি ডলার হতে পারে, অথচ বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসব পণ্য বছরে ১০০ কোটি বা ১ বিলিয়ন ডলারের কম কেনে। এ ছাড়া এলএনজি আমদানি, ১৪টি বোয়িং বিমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম কেনার কথা রয়েছে চুক্তিতে। একই সঙ্গে কিছু দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ গম, সয়াবিন, এলএনজি ও তুলা অন্য দেশ থেকে কেনে। কারণ, সেগুলো তুলনামূলক সস্তা ও দ্রুত আসে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনতে খরচ ও সময় বেশি হতে পারে। সরকারি কেনাকাটায় বেশি দামে কিনলে বাড়তি খরচ করদাতাদের বহন করতে হবে। আর বেসরকারি খাতকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনতে উৎসাহিত করতে হলে সরকারকে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দিতে হতে পারে। ফলে বছরে প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য এবং ১৫ বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি কেনা বাংলাদেশের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করবে। এ বিষয়ে চুক্তির মধ্যেই এক ধরনের স্ববিরোধিতা রয়েছে। যেমন একদিকে চুক্তিতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির কারণে প্রতিযোগিতামূলক দেশ থেকে পণ্য আনতে না বলা হয়েছে; অন্যদিকে মার্কিন পণ্যকে প্রতিযোগিতামূলক করতে বাংলাদেশকেই ভর্তুকি দিতে হতে পারে। চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর না হলেও বাংলাদেশ এরই মধ্যে কেনাকাটার জন্য আলাদা চুক্তি করেছে। এর মধ্যে বেশ কটি চুক্তি ও সমঝোতা সই হয় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। আর বিএনপি সরকারের সময় চুক্তি হলো বোয়িং কেনা নিয়ে। বাণিজ্য চুক্তিতেই ১৪টি বোয়িং কোম্পানির উড়োজাহাজ কেনার কথা রয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এ জন্য গত ৩০ এপ্রিল ১৪টি বোয়িং কেনারই চুক্তি করেছে। এর দাম ধরা হয়েছে ৩৭০ কোটি ডলার বা ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। রয়টার্স ওই দিনই এ নিয়ে তাদের রিপোর্টে বলছে, এই পদক্ষেপকে ওয়াশিংটনের বাণিজ্যচাপের প্রেক্ষাপটে ইউরোপের এয়ারবাস থেকে সরে এসে বোয়িংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। উল্লেখ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়, ২০২৩ সালে ফ্রান্স থেকে ১০টি এয়ারবাস কেনার একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ব্যবধান কমানোর কৌশলগত চাপে অন্তর্বর্তী সরকার বোয়িংয়ের পক্ষেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। আর সেই চুক্তিই করা হলো বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে। এর আগে ২০২৫ সালের ২০ জুলাই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানির চুক্তি করেছিল। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের মধ্যে এ নিয়ে করা সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাত লাখ টন গম আমদানি করবে। হুবহু এ কথাটিই মূল চুক্তিতে রয়েছে। আর মূল চুক্তি করা হয় এর সাড়ে ছয় মাস পরে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ টন গম আমদানি করে। কম দামের কারণে এর বড় অংশ আসে কৃষ্ণসাগর অঞ্চল, অর্থাৎ মূলত রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকেও অল্প কিছু গম আমদানি করা হয়। আবার ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের পাঁচটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র থেকে এক বছরে ১২৫ কোটি ডলারের সয়াবিন ও সয়াবিন মিল আমদানির জন্য চুক্তি করেছিল। এ নিয়ে ইউনাইটেড স্টেটস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিলের সঙ্গে চুক্তি সই হয়। তখন বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়িয়ে দুই দেশের প্রায় ৬ বিলিয়ন বা ৬০০ কোটি ডলারের বাণিজ্যঘাটতি কমানোই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানি চুক্তি হয় ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি। সেদিন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ ও মার্কিন কোম্পানি আর্জেন্ট এলএনজির মধ্যে প্রাথমিক সমঝোতা সই হয়। এতে বছরে সর্বোচ্চ প্রায় ৫০ লাখ টন এলএনজি সরবরাহের কথা বলা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা মূল বাণিজ্য চুক্তিতেও এলএনজি আমদানির বিষয়টি যুক্ত হয়। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের এই পারস্পরিক শুল্ক চুক্তির অর্থনৈতিক প্রভাব নানামুখী। সাধারণত প্রতিযোগিতামূলক বাজারে জ্বালানি, বিমান বা কৃষিপণ্য কোথা থেকে কেনা হবে, তা ঠিক হয় দাম, পরিবহনসুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিরাপত্তা দেখে। অথচ চুক্তি অনুযায়ী এসব পণ্য কিনতে হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সাধারণত নির্দিষ্ট দেশ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণে কেনার শর্ত থাকলে এতে শিল্পে উৎপাদনের খরচ বাড়ে, সরকারও প্রতিযোগিতামূলক দরে পণ্য কেনার সুযোগ হারায়। আবার এসব বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের বর্তমান সরবরাহকারী দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কের প্রভাব ফেলতে পারে। চুক্তির কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির বাইরে গিয়ে পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত স্বাধীনতার ওপরও প্রভাব ফেলবে। কেননা, াংলাদেশ কোন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য বা ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করবে, কোথা থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তি বা জ্বালানি কিনবে—এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর, সোর্স কোড, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ও ভর্তুকির তথ্য প্রকাশের শর্ত বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতাও সীমিত করবে। আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে চুক্তির মেধাস্বত্ব–সংক্রান্ত ধারাগুলো। এর মধ্যে ১২টি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যোগ দেওয়ার শর্তে ছোট কৃষকের বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময়ের সুযোগ কমাবে, এতে উৎপাদন খরচ বাড়বে। ওষুধ খাতেও এফডিএ অনুমোদন ও পেটেন্ট-সংক্রান্ত বাড়তি নিয়ম জেনেরিক ওষুধশিল্পের ওপর চাপ তৈরি করবে। এসব শর্ত স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে পাওয়া সুবিধাও কমিয়ে দেবে। এমনিতেই এই চুক্তি করার সময় বাংলাদেশের এলডিসি থাকাকে আদৌ বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্ক বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিওর নিয়মভিত্তিক বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, এমএফএন নীতিতে একই পণ্যে সব দেশের জন্য একই শুল্ক থাকার কথা, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র দেশভেদে আলাদা বাড়তি শুল্ক বসিয়েছে। এমএফএন বা মোস্ট ফেভারড নেশন নীতি হলো বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার একটি মৌলিক নিয়ম। এর অর্থ হচ্ছে একটি দেশ কোনো একটি দেশকে যে শু্ক বা সুবিধা দেবে, একই পণ্যে সেই সুবিধা অন্য সব ডব্লিউটিও সদস্যকেও দিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের ভিত্তি দুর্বল। কারণ, এতে শুধু পণ্য বাণিজ্যের ঘাটতি দেখা হয়েছে; কিন্তু সেবা বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বড় উদ্বৃত্ত বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। প্রযুক্তি, আর্থিক সেবা, মেধাস্বত্ব ও ডিজিটাল খাতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে বড় আয় করে। যেমন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যঘাটতি ছিল ৯৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার; কিন্তু সেবায় উদ্বৃত্ত ছিল ২৯ বিলিয়ন ডলার। তাই শুধু পণ্যে ঘাটতি দেখিয়ে কোনো দেশকে অন্যায্য সুবিধাভোগী বলা অর্থনৈতিকভাবে একপেশে। আবার পাল্টা বা পারস্পরিক শুল্ক ডব্লিউটিওর নিয়মের বিরুদ্ধে গেলেও এই চুক্তিতে বাংলাদেশকে ডব্লিউটিওতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সমর্থন করতে বলছে। যেমন ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশনের ওপর স্থায়ীভাবে শুল্ক না বসানোর প্রস্তাব সমর্থন করতে বলা হয়েছে, যা বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে। আবার বাংলাদেশকে মৎস্য–ভর্তুকি চুক্তি ও বাণিজ্য সহজীকরণ চুক্তি বাস্তবায়ন করতেও বলা হয়েছে; কিন্তু এতে এলডিসি ও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধার বিষয়টি অস্পষ্ট। এই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রায় সব মার্কিন পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সমান সুবিধা দিচ্ছে না। ফলে অন্য দেশও বাংলাদেশের কাছে একই সুবিধা চাইতে পারে, আর না দিলে ডব্লিউটিওর এমএফএন নীতি ভঙ্গের অভিযোগ উঠতে পারে। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কহার হবে ১৯ শতাংশ। এই শুল্ক অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান এমএফএন শুল্কের সঙ্গে যুক্ত হবে। পারস্পরিক বা পাল্টা শুল্ক থেকে ছাড় পাওয়া পণ্য বাদ দিলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের আমদানি-ওজনভিত্তিক গড় শুল্ক দাঁড়াবে প্রায় ৩৪ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ এমএফএন শুল্ক এবং ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক। অর্থাৎ বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আরও বেশি শুল্কের মুখে পড়বে। অন্যদিকে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের গড় আমদানি শুল্ক এখন প্রায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ। তবে কর রেয়াত ধরলে কার্যকর গড় শুল্ক দাঁড়ায় প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ। আর নতুন চুক্তি পুরোপুরি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ পণ্যে এই শুল্ক প্রায় শূন্যে নেমে আসবে। ফলে দুই দেশের শুল্ক ব্যবধান আরও বড় হবে। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পণ্যে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে শুল্ক কমাবে বা পুরোপুরি তুলে দেবে। এ জন্য পাঁচ ধরনের শ্রেণি রাখা হয়েছে। যেমন ইআইএফ শ্রেণির পণ্যে চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই শুল্ক শূন্য হবে। বি-৫ শ্রেণিতে শুরুতেই অর্ধেক শুল্ক কমবে, বাকি অংশ ধাপে ধাপে কমে পঞ্চম বছরে শূন্য হবে। বি-১০ শ্রেণিতে একইভাবে প্রথমে অর্ধেক কমবে, বাকি অংশ দশম বছরে গিয়ে শূন্য হবে। যে পণ্যে শুল্ক আগেই শূন্য, সেখানে তা শূন্যই থাকবে। আর এক্স শ্রেণির প্যে কোনো ছাড় নেই, আগের এমএফএন শুল্কই বহাল থাকবে। এ নিয়ে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ আগামী ১০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ৭ হাজার ১৩২টি ট্যারিফ লাইনের পণ্যে এমএফএন শুল্ক তুলে নেবে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৯২২টি পণ্যচুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুল্কমুক্ত হবে। আরও ২ হাজার ২১০টি পণ্য ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে শুল্কমুক্ত হবে। এই ছাড়ের বড় অংশ শুরুতেই কার্যকর হবে। অর্থাৎ চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরপরই অনেক মার্কিন পণ্যে শুল্ক কমে যাবে বা উঠে যাবে। ফলে বাংলাদেশ রাজস্ব হারাবে শুরু থেকেই। যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ৩২৬টি পণ্য শুল্কমুক্ত তালিকার বাইরে থাকবে; কিন্তু বাংলাদেশ বর্তমানে এসব পণ্য খুব কম আমদানি করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে আমদানির ১ হাজার ৬৩৮টি ট্যারিফ লাইনকে পাল্টা শুল্কের তালিকার বাইরে রাখার কথা বলেছে। তবে এসব পণ্যে এমএফএন শুল্ক বহাল থাকবে। এই তালিকার বাণিজ্যিক মূল্য বাংলাদেশের জন্য সীমিত। কারণ, বাংলাদেশ বর্তমানে এর মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি পণ্য সামান্য পরিমাণে রপ্তানি করে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য, বিশেষ করে পোশাক, এই তালিকার বড় সুবিধা পাচ্ছে না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর প্রায় ১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন বা ১২৪ কোটি ডলার শুল্ক আদায় করেছিল। একই সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর প্রায় ১৮০ মিলিয়ন বা ১৮ কোটি ডলার শুল্ক আদায় করেছিল। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের আদায় ছিল বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি। আর নতুন চুক্তি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক আদায় ১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ২ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশে মার্কিন পণ্যের ওপর প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ডলারের শুল্ক প্রায় শূন্যে নেমে আসবে। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও মানবসৃষ্ট তন্তু দিয়ে তৈরি কিছু পোশাকে পাল্টা শুল্ক থাকবে না। তবে আগের যে এমএফএন শুল্ক প্রায় ১৬ শতাংশ, তা বহাল থাকবে। দেখা গেছে, বাংলাদেশে তুলা আমদানির ৪০ শতাংশ আসে আফ্রিকার দেশগুলো থেকে। প্রায় ২৫ শতাংশ আসে ব্রাজিল থেকে, ১৫ শতাংশ ভারত থেকে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে মাত্র ৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা অন্যদের তুলনায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেশি দামি। এর সঙ্গে পরিবহন খরচও আছে। বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ১৯ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। চুক্তিতে বলা আছে, বাংলাদেশ থেকে আমদানি হওয়া ‘নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্যের’ ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বসবে না, তবে তা ‘পরে নির্ধারিত একটি পরিমাণ’ পর্যন্ত। সুতরাং শেষ পর্যন্ত পোশাকপণ্য কতটা সুবিধা পাবে তা নির্ভর করবে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের একক সিদ্ধান্তের ওপর। অর্থাৎ ছাড় পেলেও এসব পোশাক বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুরোপুরি শুল্কমুক্ত হবে না। পুরো চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র তিনবার হুমকি দিয়েছে যে শর্ত না মানলে তারা চুক্তি বাতিল করবে এবং আগের দেওয়া বাড়তি শুল্ক আরোপ করবে। প্রথম হুমকি ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে। বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কোনো দেশের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করা যাবে না। দ্বিতীয় হুমকি বাজারভিত্তিক নয় এমন দেশের সঙ্গে চুক্তি করা নিয়ে। যেমন বাংলাদেশ যদি কোনো অবাজার অর্থনীতির দেশের সঙ্গে এমন চুক্তি করে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি দুর্বল হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে অবাজার অর্থনীতি বা নন-মার্কেট ইকোনমি দেশের একটি তালিকা আছে। অর্থাৎ যেখানে পণ্যের দাম পুরোপুরি বাজারের নিয়মে ঠিক হয় না। দেশগুলো হলো অ্যাঙ্গোলা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, চীন, জর্জিয়া, কিরগিজ প্রজাতন্ত্র, লাওস, মলদোভা, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম। এসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করলে যুক্তরাষ্ট্র তা মানবে না। অর্থাৎ াংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমল। এই ধারার কারণেই কি রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন লাগছে? চুক্তিতে আরও আছে, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনবে না, যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থকে ঝুঁকিতে ফেলে। তবে দুটি ছাড় আছে। যেমন যদি বিকল্প সরবরাহকারী না থাকে অথবা আগে যদি অন্য চুক্তি থেকে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় হুমকি হচ্ছে, এই বাণিজ্য চুক্তি থাকলেও অন্যায্য বাণিজ্য, হঠাৎ আমদানি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার কারণে যুক্তরাষ্ট্র আরও অতিরিক্ত শুল্ক বসাবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে এই চুক্তির কোনো ধারা বাংলাদেশ মানেনি, তাহলে আগের পারস্পরিক শুল্কহার ফিরিয়ে আনবে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এই বাণিজ্য চুক্তির কারণে বাংলাদেশের বাণিজ্যসংক্রান্ত সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত হতে পারে। যেমন রাশিয়ার সহায়তায় তৈরি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ করতে গেলে রাশিয়া থেকে রিঅ্যাক্টর কেনা যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারিতে পড়তে পারে। চীনের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। অথচ চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস এবং বেসরকারি খাত সেখান থেকে সস্তা, প্রতিযোগিতামূলক ও দ্রুত সরবরাহযোগ্য পণ্য আনে। যুক্তরাষ্ট্র ৫৭টি দেশ ও অঞ্চলের ওপর পাল্টা শুল্কহার ঘোষণা করেছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশসহ ৯টি দেশের সঙ্গে আলাদা চুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড) করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশগুলো হলো মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, আর্জেন্টিনা, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া ও ইকুয়েডর। দেখা গেছে, বাংলাদেশর সঙ্গে করা চুক্তিটি অনেক বেশি কঠোর। অন্য দেশের চুক্তি বেশি পারস্পরিক, কাঠামোগত, নিয়মভিত্তিক ও বাণিজ্য সম্প্রসারণমুখী; কিন্তু বাংলাদেশের চুক্তি বেশি শর্তযুক্ত, অনুপালননির্ভর, নির্দেশনামূলক, বাধ্যতামূলক ক্রয়সমৃদ্ধ, অসম ও রাজস্ব ক্ষতির ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। ২০২১-২২ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ছিল ১ হাজার ৪২ কোটি ডলার। পরের বছর তা কমে ৮৫২ কোটি ডলারে নেমে আসে এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরও কমে দাঁড়ায় ৭৬০ কোটি ডলারে। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে রপ্তানি বেড়ে ৮৬৯ কোটি ডলার হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ১৮ শতাংশের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। খাতভিত্তিক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির বড় অংশই তৈরি পোশাক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাতে রপ্তানি হয়েছে ৭৫৫ কোটি ডলার। এর বাইরে ক্যাপ ২৬ কোটি ডলার এবং হোম টেক্সটাইল ১৫ কোটি ডলার রপ্তানি হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানিও বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি ছিল ২৫৪ কোটি ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ২৭১ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত হয়েছে ৫৯৮ কোটি ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৫০৬ কোটি ডলার। প্রবাসী আয়েও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই দেশ থেকে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছিল ৩৪৪ কোটি ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ৪৭৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ এই চুক্তি করার ১১ দিন পরে ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বেশির ভাগ পাল্টা চুক্তি আরোপ বাতিল করে দেন। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের এই রায়ের পরই মালয়েশিয়া বলেছে, রায়ের কারণে মালয়েশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা চুক্তি অকার্যকর হয়ে গেছে। দেশটির সংসদ সদস্যরাও অনুমোদন স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছেন। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এ নিয়ে গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি কার্যকরের এখনো আনুষ্ঠানিকতা বাকি আছে। চলতি মে মাসের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী ব্রেন্ডান লিঞ্চ ঢাকায় আসছেন। তখন বাণিজ্য চুক্তির সার্বিক বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর না হলে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি কমাতে গম, ভোজ্যতেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তুলা ইত্যাদি পণ্য কেন বেশি করে আমদানি করা হচ্ছে এবং সেগুলো কীভাবে হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এসব পণ্য কোথাও না কোথাও থেকে আমাদের আমদানি করতেই হবে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফোরাম অ্যাগ্রিমেন্ট বা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তি সই হয়েছিল ২০১৩ সালের নভেম্বরে। এর উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ-সম্পর্কিত সমস্যা, বাধা ও সম্ভাবনা নিয়ে নিয়মিত আলোচনার একটি আনুষ্ঠানিক ফোরাম তৈরি করা। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে টিকফার আওতায় সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। ঢাকায় অনুষ্ঠিত সেই বৈঠক ছিল টিকফার সপ্তম বৈঠক। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান টিকফার কার্যকর ব্যবহারসহ সামগ্রিক বিষয় নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায় বাংলাদেশকে নতুন আলোচনার সুযোগ দিয়েছে। বাংলাদেশের উচিত এই সুযোগ গ্রহণ করে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে মার্কিন পক্ষকে নিজেদের উদ্বেগগুলো তুলে ধরা। তবে মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একক রপ্তানি বাজার, বিদেশি বিনিয়োগের বড় উৎস এবং সম্ভাবনাময় বাজার। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা–সংক্রান্ত যে কাঠামো চুক্তি বা টিকফা প্ল্যাটফর্ম আছে, আলোচনার জন্য বাংলাদেশ তা সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করতে পারে।Published: প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ০৪: ২৯
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!