সকালের হিমেল হাওয়া ভেসে আসছে। জানালার পর্দা সরাতেই চোখে পড়ছে নীল জলরাশির সুইমিংপুল আর চারপাশের সাজানো সবুজ বাগান। একটু দূরেই আধুনিক জিমনেসিয়ামে শরীরচর্চা করছেন প্রতিবেশীরা। শিশুদের খেলার জন্য রয়েছে নিরাপদ উন্মুক্ত মাঠ আর বয়স্কদের হাঁটার জন্য আলাদা ওয়াকওয়ে। নেই যানজটের শব্দ, নেই ধুলাবালুর উপদ্রব। এটি কোনো বিদেশের দৃশ্য নয়, বরং রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশে গড়ে ওঠা আধুনিক ‘সমন্বিত আবাসন’ বা ‘ইন্টিগ্রেটেড হাউজিং’-এর প্রাত্যহিক চিত্র।
আবাসন খাতের দীর্ঘদিনের বিবর্তন শেষে এখন আমরা এমন এক যুগে দাঁড়িয়েছি, যেখানে মানুষের চাহিদা কেবল চার দেয়ালের একটি ফ্ল্যাট নয়। আধুনিক নাগরিকেরা এখন এমন এক ঠিকানা খুঁজছেন, যেখানে নিরাপত্তা, বিনোদন, স্বাস্থ্য ও আভিজাত্য—সবই থাকবে এক সীমানার ভেতর। আর এই চাহিদা ঘিরেই বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে কনডোমিনিয়াম ও গেটেড কমিউনিটি। দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো এ ধরনের প্রকল্পে এখন বেশি নজর দিচ্ছে। এ ধরনের আবাসনে ক্রেতাদেরও কদর বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বেশ কয়েকটি কোম্পানির কর্মকর্তারা।
ফ্ল্যাটের সঙ্গে বিশেষ সুবিধা: জীবনযাপনে পূর্ণতা
গত এক দশকে বাংলাদেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও রুচির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। আগে একটি ফ্ল্যাট কেনার সময় মানুষ শুধু তার বর্গফুট আর লোকেশন দেখত। কিন্তু এখন ক্রেতারা গুরুত্ব দিচ্ছেন ‘মানসম্ম�� জীবনযাত্রা’কে। সমন্বিত আবাসনে ফ্ল্যাটের মূল্যের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত থাকে অসংখ্য প্রিমিয়াম সুবিধা:
কমিউনিটি স্পেস: উৎসব বা সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য আলাদা ব্যাংকুয়েট হল।
ইনডোর গেমস ও জিম: টেবিল টেনিস, বিলিয়ার্ড থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক শরীরচর্চা কেন্দ্র।
সুরক্ষিত পরিবেশ: ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ এবং প্রশিক্ষিত সিকিউরিটি গার্ড।
দৈনন্দিন প্রয়োজন: একই সীমানার মধ্যে সুপারশপ, ফার্মেসি, এমনকি এটিএম বুথ।
হাঁটা ও সাঁতার কাটা: এমন আবাসনে আলাদা হাঁটার জায়গা ও সুইমিংপুল রাখা হচ্ছে।
কন্ডোমিনিয়াম ও গেটেড কমিউনিটির বিবর্তন
বাংলাদেশে আবাসন খাতের রূপান্তরের মূলে রয়েছে ‘কনডোমিনিয়াম’। মূলত বড় জায়গার ওপর যখন সুউচ্চ একাধিক ভবন এবং প্রচুর খোলা জায়গা রাখা হয়, তাকেই কনডোমিনিয়াম বলা হয়। অন্যদিকে ‘গেটেড কমিউনিটি’ হচ্ছে একটি প্রাচীরবেষ্টিত এলাকা, যেখানে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত এবং ভেতরে নিজস্ব স্বায়ত্তশাসিত সব সুবিধা থাকে।
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় আবাসন কোম্পানিগুলোর ভূমিকা
বাংলাদেশের আবাসন খাতকে আধুনিক ও বিশ্বমানের রূপ দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে শীর্ষস্থানীয় কিছু ডেভেলপার কোম্পানি। র ্যাংকস এফসি, শান্তা প্রপার্টিজ, নাসরুল প্রপার্টিজ, অ্যাসেট ডেভেলপমেন্ট, কনকর্ড, আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ, রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট, শেলটেক ও ইস্টার্ন হাউজিংয়ের মতো কোম্পানিগুলো এখন কেবল আবাসন নয়, বরং ‘কনসেপ্ট’ বিক্রি করছে।
বিশেষ করে রূপায়ণ সিটির ‘রূপায়ণ সিটি উত্তরা’ বাংলাদেশের আবাসন ইতিহাসে অন্যতম বড় গেটেড কমিউনিটি হিস��বে পরিচিতি পেয়েছে। তারা ‘প্রিমিয়াম কনডো’র ধারণা বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অন্যদিকে শান্তা প্রপার্টিজ তাদের সুউচ্চ টাওয়ারগুলোতে আভিজাত্য আর প্রযুক্তির চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়েছে। নতুন করে আরও গেটেড কমিউনিটির আবাসন পরিকল্পনা করেছে। এসব কোম্পানি এখন স্থপতিদের দিয়ে এমন নকশা করাচ্ছে, যেখানে সূর্যালোক আর বাতাসের অবাধ চলাচলের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কেন মানুষ এখন রিসোর্ট-লাইফস্টাইল পছন্দ করছেন? এর উত্তর খুব সহজ—ছুটির দিনেও মানুষ এখন আর ঢাকার যানজট ঠেলে রিসোর্টে যেতে চান না। তাঁরা চান, নিজের ঘরই যেন হয় প্রশান্তির জায়গা।
আধুনিক এ প্রজেক্টগুলোতে ল্যান্ডস্কেপিং এমনভাবে করা হয়, যেন মনে হয় কোনো বিলাসবহুল রিসোর্ট। বড় বড় লন, কৃত্রিম ফোয়ারা, রুফ-টপ গার্ডেন ও সুইমিংপুলের চারপাশের সাজসজ্জা নাগরিক জীবনে গ্রামের স্নিগ্ধতা ফিরিয়ে আনছে। বড় বড় কাচের জানালা আর খোলামেলা বারান্দা থেকে বাইরের সবুজের দৃশ্য ঘরকে একটি রিসোর্ট বা হলিডে হোমের আবহে রূপ দিচ্ছে। স্থাপত্যবিদেরা একে বলছেন ‘বায়োফিলিক ডিজাইন’, যা মানুষের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস (বিটিআই) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এফ আর খান প্রথম আলোকে বলেন, এখন বেশির ভাগ ক্রেতা ভালো আবাসন খোঁজেন। তাঁরা আরামদায়ক জায়গায় যাবেন, এটাই স্বাভাবিক। গেটেড কমিউনিটিতে সব সুবিধা থাকায় অফিস থেকে বাসায় এসেই আর বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না।
এফ আর খান বলেন, ঢাকায় জমির উচ্চমূল্যের কারণে সেখানে নির্মাণ ব্যয় অনেক বেশি পড়ে। তাই আশপাশের এলাকায় প্রকল্প করা হলে ক্রেতাদের তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে ফ্ল্যাট বা জমি দেওয়া সম্ভব হবে। তবে এ ক্ষেত্রে যাতায়াত অবকাঠামো নিশ্চিত করতে জোর দিতে হব��।
এফ আর খান বলেন, বিটিআই বাংলাদেশে বিভিন্ন কন্ডোমিনিয়াম প্রকল্প করছে, যা আধুনিক সুবিধা, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। আগামী দিনে সবাই এদিকে মনোযোগী হয়েছেন।
তবে এ খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো উপযুক্ত জমির অভাব এবং নির্মাণ উপকরণের উচ্চমূল্য। সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত সহায়তা, সুলভ ঋণের ব্যবস্থা এবং ঢাকার বাইরের সংযোগ সড়কগুলোর উন্নয়ন করা গেলে ঢাকার উপকণ্ঠে আরও বড় বড় গেটেড কমিউনিটি গড়ে তোলা সম্ভব।
আদর্শ কমিউনিটি আবাসনে কী কী সুবিধা থাকা জরুরি
আপনি যখন একটি আধুনিক গেটেড কমিউনিটি বা কনডোমিনিয়ামে ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা করবেন, তখন নিচের ১০টি মূল বিষয় নিশ্চিত করে নিন:
১. উন্মুক্ত সবুজ ও ল্যান্ডস্কেপিং: প্রজেক্টের মোট জায়গার অন্তত ৪০-৫০ শতাংশ অংশ কি খোলা রাখা হয়েছে? বাগান, বসার জায়গা ও সবুজের সমারোহ থাকা জরুরি।
২. বহুমুখী নিরাপত্তাব্যবস্থা: শুধু গেটকিপার নয়, বরং ২৪/৭ সিসিটিভি ক্যামেরা, ইন্টারকম সুবিধা এবং প্রতিটি ভবনে ডিজিটাল অ্যাকসেস কন্ট্রোল আছে কি না দেখে নিন।
৩. স্বাস্থ্য ও ব্যায়ামাগার: একটি আধুনিক জিমনেসিয়াম, বড়দের ও ছোটদের জন্য আলাদা সুইমিংপুল এবং যোগব্যায়াম বা মেডিটেশন করার জন্য শান্ত জায়গা থাকা প্রয়োজন।
৪. হাঁটা ও দৌড়ানোর পথ: দূষণমুক্ত পরিবেশে সকাল-বিকেল হাঁটার জন্য প্রকল্পের ভেতরেই আলাদা ওয়াকওয়ে বা জগিং ট্র্যাক আছে কি না, নিশ্চিত করুন।
৫. শিশুদের খেলার নিরাপদ জোন: শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য একটি সুরক্ষিত খেলার মাঠ ও ইনডোর প্লে-জোন থাকা অপরিহার্য।
৬. কমিউনিটি ও সোশ্যাল স্পেস: পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য সুপরিসর ব্যাংকুয়েট হল বা কমিউনিটি সেন্টার ���বং প্রতিবেশীদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার জন্য লাউঞ্জ আছে কি না।
৭. নিজস্ব সুপারশপ ও জরুরি সেবা: দৈনন্দিন কেনাকাটার জন্য একটি ছোট গ্রোসারি শপ বা সুপারশপ, ফার্মেসি ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা সীমানার ভেতর থাকা উচিত।
৮. নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ: শক্তিশালী পাওয়ার ব্যাকআপ বা জেনারেটর-সুবিধা এবং নিজস্ব পানির শোধনাগার (ডব্লিউটিপি) বা সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) আছে কি না, দেখে নিন।
৯. ইনডোর স্পোর্টস ও বিনোদন: ব্যাডমিন্টন কোর্ট, টেবিল টেনিস বা বিলিয়ার্ডের মতো ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা থাকা আধুনিক আবাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
১০.পর্যাপ্ত পার্কিং ও ড্রাইভওয়ে: আপনার গাড়ির জন্য সুনির্দিষ্ট পার্কিং স্পেস এবং প্রকল্পের ভেতরে অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের মতো প্রশস্ত রাস্তা থাকা বাধ্যতামূলক।
Published: প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০: ০২
Source: https://www.prothomalo.com/business/industry/es2713aeow
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!