
বিখ্যাত জার্মান সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, প্রকৃতিবিশারদ, দার্শনিক, ইতিহাসবেত্তা ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক কার্ল মার্ক্স ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের ৫ মে জন্মগ্রহণ করেন। অর্থনীতি, সমাজ, রাজনীতি ও পরিবেশ সংক্রান্ত মার্ক্সের তত্ত্বসমূহ মার্ক্সবাদ নামে পরিচিত। কার্ল মার্ক্স রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দার্শনিক হিসেবে সমধিক পরিচিত । তবে উন্নয়ন ও শিল্পায়নকেন্দ্রিক আলোচনায় তার গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবেশ চিন্তার সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ককে নির্ভরশীলতার আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ভাবনায়, প্রকৃতিকে শুধু নির্জীব বস্তুগত বিষয় না ভেবে মানুষের বেঁচে থাকার ভিত্তি হিসেবে দেখা দরকার। মানুষ প্রকৃতির অংশ হিসেবে প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে পরিবেশ ও নিজের বিবর্তন করে। মার্কসবাদ ও প্রকৃতি: মার্কসীয় দর্শনে বলা হয়েছে, পুঁজিবাদ প্রকৃতি ও পরিবেশকে তিলে তিলে ক্ষয় করে ফেলে। পুঁজিবাদ শুধু শ্রমিককে শোষণ করে না, এটি প্রকৃতি ধ্বংসের জন্য দায়ী। মার্ক্সের ভাবনায় প্রকৃতিকে তুলে ধরা হয়েছে মানুষের ‘অজৈব শরীর’ হিসেবে। ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ‘অর্থনৈতিক ও দার্শনিক পাণ্ডুলিপি’তে উল্লেখ করা হয়েছে- ‘প্রকৃতি হলো মানুষের অজৈব শরীর।’ মানুষ বেঁচে থাকার জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। খাদ্য, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো জীবন ধারণকারী উপাদান সবই আসে প্রকৃতি থেকে। আমাদের পা বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেমন জৈব শরীর তেমনি পানি, বায়ু ও মাটি আমাদের অজৈব শরীর। প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে অস্তিত্বের সংকটে পড়া। মার্ক্সের ‘বিপাকীয় ফাটল’ তত্ত্ব অনুসারে, প্রকৃতি সম্পদের উৎস বটে তবে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা প্রকৃতির সাথে মানুষের যে বন্ধন তার ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলে। অতি মুনাফার লোভে মাটি দূষণ হচ্ছে, বন উজাড় হচ্ছে, জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। ফলশ্রতিতে প্রকৃতির ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। মার্ক্সবাদী দর্শন মতে, প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হলে উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। প্রকৃতির উপর থেকে অতি বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করতে হবে। পুঁজিবাদের সীমাহীন মুনাফা ও সম্পদের অসম বন্টন থেকে প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হবে। মার্ক্সবাদের ভাবনায় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। যেখানে উৎপাদন ব্যবস্থায় অতি মুনাফার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মার্ক্সবাদে প্রকৃতির উপর আধিপত্যবাদ সৃষ্টিজগতের সবার জন্য হুমকি মনে করা হয়। পুঁজিবাদ ও পরিবেশ সংকট: পুঁজিবাদের সাথে পরিবেশ সংকটের সম্পর্ক বিপরীত। পুঁজিবাদ যত ঘনিভূত হয় পরিবেশ-প্রকৃতি তত সংকটে নিমজ্জিত হয়। পুঁজিবাদী উৎপাদন বা কৃষি ব্যবস্থা শ্রমিকের যেমন প্রাণশক্তি নষ্ট করে দেয় তেমনি মাটিরও জীবনীশক্তি বিনষ্ট করে দেয়। পুঁজিবাদ অসীম সম্পদ অর্জনকে উৎসাহিত করে। যেনতেনভাবে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে হলেও অতি মুনাফাকে উন্নয়ন হিসেবে তুলে ধরে। ফলে পরিবেশের বিপর্যয় নেমে আসে। পরিবেশ ও জলবায়ু ইস্যুতে মার্ক্সবাদ: মার্ক্সবাদ মনে করে, জলবায়ু পরিবর্তন প্রকৃতির কারণে এমনি এমনি ঘটছে না। এটি পুঁজিবাদের সীমাহীন প্রবৃদ্ধি ও লোভ-লালসার ফসল। মানুষ প্রকৃতি থেকে সম্পদ শুধু আহরণ করেই যাচ্ছে, বিনিময়ে সেটি আর পুনর্ভরণ করছে না। মার্ক্সীয় বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, পুঁজিবাদ প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত সম্পদ বিনামূলে পাওয়া পন্য হিসেবে মনে করে। কার্বন নিঃসরণ করার ফলে প্রকৃতিতে বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ দেখা যাচ্ছে। ফলে বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা নয়, প্রকৃতি থেকে সম্পদ আহরণে পরিবর্তন হলেই কেবল মানুষের সাথে প্রকৃতির বন্ধন যেমন মজবুত হবে তেমনি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধ করা সম্ভব হবে। মার্ক্সবাদের ভাবনায় কেবল দূষণ প্রতিরোধ ও গাছকাটা বন্ধ করলেই পরিবেশ সমস্যার সমাধান হবে না। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। যার মূলে রয়েছে পুঁজিবাদীকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা। প্রকৃতির ওপর সীমাহীন শোষণ বন্ধ ও লাগামহীন মুনাফাকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার হ্রাস না টানলে মানব সভ্যতা অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। লেখক: শিক্ষক
Published: 05/05/2026 07:56 am
Source: https://www.dainikshiksha.com/bn/news/marxism-and-nature-a-philosophy-of-inseparable-existence-370770
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!