বুদ্ধের সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

অমর্ত্য সেন অমর্ত্য সেন
Published

২০১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শান্তিনিকেতনে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের শিক্ষক ও গবেষক সুধাকর চট্টোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে অমর্ত্য সেনের দেওয়া ‘সুধাকর চট্টোপাধ্যায় স্মারক বক্তৃতা’।

প্রথম পর্ব

মহান কবি ও ঔপন্যাসিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) একবার এই বলে দুঃখ করেছিলেন যে তিনি গৌতম বুদ্ধের সময়ে জন্মাননি। রবি ঠাকুর প্রায়ই ভাবতেন—যদি বুদ্ধের সঙ্গে কথা বলা যেত!

আমার অনুভূতিও রবীন্দ্রনাথের মতোই, কারণ আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধ যে চিন্তা ও যুক্তি আমাদের জন্য রেখে গেছেন, তা আজও আমরা উপভোগ করতে পারি এবং তা থেকে শিক্ষা নিতে পারি। আমাদের আজকের পৃথিবী হয়তো খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে বুদ্ধ যে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন, তার থেকে অনেক ভিন্ন। কিন্তু নৈতিকতা, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক বিষয়ে মানুষের বোঝাপড়ায় তিনি যে যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি এনেছিলেন, তা থেকে আমরা এখনো গভীরভাবে উপকৃত হতে পারি।

আমার পিতামহ গৌতম বুদ্ধের ওপর লেখা একটি ছোট্ট বই আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। সেই প্রথমবারের মতো আমি বুদ্ধের চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। তখন থেকেই কেন আমি বুদ্ধচিন্তা দিয়ে এমন গভীরভাবে আলোড়িত ও প্রভাবিত—সে কথা প্রায়ই ভাবি। আমার বয়স তখন ১১ বা ১২। আমার মনে আছে, আমি পুরোপুরি আবিষ্ট হয়ে গিয়েছিলাম। আসলে কিছু মৌলিক অর্থে বুদ্ধ অত্যন্ত সমকালীন রয়ে গেছেন এবং এই ঐতিহ্যিক দিকটিই এ প্রবন্ধের বিষয়।

যখন তরুণ গৌতম তাঁর হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে আলোকপ্রাপ্তির উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। তখন তিনি বিশেষভাবে মৃত্যু, রোগ ও অক্ষমতার দৃশ্য দেখে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। প্রতিটি দৃশ্যই তাঁকে বিচলিত করেছিল। চারপাশে যে অজ্ঞতা তিনি দেখতে পেয়েছিলেন, তা-ও তাঁকে গভীরভাবে বিচলিত করেছিল। গৌতম বুদ্ধের বিচলনের উৎস বোঝা কঠিন নয়—বিশেষত তা মানবজীবনের যত বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তা।

‘এখানে-এখন’ (হিয়ার অ্যান্ড নাউ) নীতিতে নিবদ্ধ থেকেও বুদ্ধের চিন্তা ক্রমে আরও অতীন্দ্রিয় চিন্তার দিকে—বিশ্ব সম্পর্কে এক অধিবিদ্যাগত উপলব্ধির দিকে—অগ্রসর হয়েছিল। তবে এখানে বুদ্ধের চিন্তার সেই দিকটি নয়, বরং পার্থিব সমস্যাগুলোর প্রতি তাঁর যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গির ওপরই গুরুত্ব দেব। বৌদ্ধধর্মকে যেহেতু প্রায়ই অতি অপার্থিব এক ধর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাই এখানে আমি ‘আরেক বুদ্ধ’-এর বিবরণ ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করছি। যিনি সেই বুদ্ধের মতোই বাস্তব, দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বৌদ্ধধর্মের প্রধান ধারাগুলো যাঁকে পরম শ্রদ্ধা করেছে (এবং কখনো কখনো তাঁর ওপর দেবত্ব আরোপ করেছে)।

বুদ্ধের ধারণা এবং সেই ধারণার পেছনে থাকা ব্যক্তিত্ব—অন্য রকম সহজগম্য, যা সত্যিই বিস্ময়কর। কেন তাঁকে এমন সহজ মনে হয়? এর একটি কারণ, বুদ্ধের ভাবনা অন্য ধর্মীয় নেতাদের তুলনায় সহজে গ্রহণ করা যায়। তাঁর জীবনের গল্পই স্পষ্ট করে দেয় যে তিনি এমন সব সমস্যার কথা বলেছেন, যা যেকোনো সাধারণ মানুষকে বিচলিত করে: মৃত্যুভয়, বার্ধক্য ও অক্ষমতার ট্র্যাজেডি এবং মানবজীবনে রোগব্যাধির ভয়াবহ প্রভাব।

আমরাও অজ্ঞতা এবং অসংগঠিত সমাজের বিপদ দেখতে পাই—যেসব বিষয়ে বুদ্ধ তাঁর আলোকপ্রাপ্তির দিকে যত এগিয়েছেন, ততই গভীরভাবে ভেবেছেন। বুদ্ধের জীবনকাহিনিতে যে মৌলিক মানবিকতা রয়েছে, তা আমাদের নিজেদের জীবনেও সহজে উপলব্ধি ও আত্মস্থ করা যায়।

এই ‘সাধারণত্ব’ বুদ্ধকে উন্নত বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিযাত্রায় অসাধারণভাবে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। বুদ্ধের সহজ চিন্তা আমার কাছে স্পষ্ট হয় ১৯৯০-এর দশকে। তখন কথিত ‘মানব উন্নয়ন’ পদ্ধতি একটি শক্তিশালী বিশ্লেষণধারা হয়ে উঠেছিল। ১৯৮৯ সালে যখন আমার বন্ধু—দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চিন্তাবিদ মাহবুব উল হক—আমাকে তাঁর ‘মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন’ প্রণয়নের মহৎ উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান, আমি সঙ্গে সঙ্গেই বুদ্ধের কথা ভেবেছিলাম। প্রতিবেদনটি ১৯৯০ সাল থেকে জাতিসংঘের একটি বার্ষিক প্রকাশনায় পরিণত হয়। ‘মানব উন্নয়ন সূচক’ (হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স—এইচআইডি) আজকের বিশ্বে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও অঞ্চলের আপেক্ষিক উন্নয়ন অগ্রগতি পরিমাপের সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সামাজিক নির্দেশকে পরিণত হয়েছে। মানব উন্নয়ন সূচক প্রণয়নের ক্ষেত্রে মাহবুব উল হকের লক্ষ্য ছিল উন্নয়ন অধ্যয়নের সামগ্রিক ধারা। বিশেষত, উন্নয়ন অর্থনীতির মনোযোগকে তিনি ‘মোট দেশজ উৎপাদনের’ (গ্রস ডমেস্টিক প্রোডাক্ট) মতো দূরবর্তী ‘ভালোভাবে বেঁচে থাকা’র সূচক থেকে সরিয়ে এনে প্রত্যেক মানুষের জীবনের গুণগত মানের দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন। এবং মানুষ যে ধরনের জীবনকে মূল্যবান বলে মনে করার যুক্তি খুঁজে পায়, সে ধরনের জীবনযাপনের প্রকৃত স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়েছিলেন। মানব উন্নয়ন পদ্ধতি মানুষের আয়ু, শিক্ষা, চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং এ ধরনের অন্যান্য বিষয়সংশ্লিষ্ট নির্দেশকের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে—যেগুলোর সঙ্গে আড়াই হাজার বছর আগে তরুণ বুদ্ধকে বিচলিত করা সমস্যাগুলোর বিস্ময়কর মিল রয়েছে।

অবশ্যই, এই উদ্বেগগুলো কেবলই বুদ্ধের নয়, অন্য ধর্মীয় নেতাদের মধ্যেও দেখা যায়। যেমন, মানবিক দুরবস্থা খ্রিষ্টীয় চিন্তা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে। অন্য ধর্মগুলোতেও বিভিন্নভাবে এসবের প্রতিফলন রয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে শুধু বুদ্ধের ভাবনাতেই এই বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে, তা নয় (এ ক্ষেত্রে ভারতের মহাবীর জৈন এবং চীনের কনফুসিয়াসের নাম বলা যেতে পারে)। তবে বুদ্ধের জীবনের কাহিনিই—রাজকীয় জীবন ত্যাগসহ—এই উদ্বেগগুলোর কেন্দ্রীয়তাকে অত্যন্ত সহজবোধ্যভাবে তুলে ধরেছে। বুদ্ধের এই সহজবোধ্যতা সম্ভবত আরও ভালোভাবে বোঝা যেতে পারে লুডভিগ ভিটগেনস্টাইনের একটি বক্তব্যের মাধ্যমে, যিনি বুদ্ধ ও বৌদ্ধধর্ম নয় বরং খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে কথা বলেছিলেন। ভিটগেনস্টাইন বলেছিলেন, তিনি সেন্ট পলের এপেস্টলের বৌদ্ধিক উচ্চতার তুলনায় গসপেলের গভীরে বেশি নিমগ্ন হয়েছিলেন—‘আমার কাছে মনে হয় গসপেলে সবকিছুই কম আড়ম্বরপূর্ণ, বেশি বিনয়ী এবং বেশি সরল। সেখানে আপনি কুঁড়েঘরের বিবরণ পাচ্ছেন। আর পলের লেখায় পাচ্ছেন একটি গির্জা। গসপেলে সব মানুষ সমান এবং ঈশ্বর স্বয়ং একজন মানুষ। কিন্তু পলের রচনায় একপ্রকার শ্রেণিবিন্যাস দেখা যায়—যেমন, সম্মান ও প্রাতিষ্ঠানিক পদমর্যাদা।’

আমার মতে, বুদ্ধের গভীর ও চিরায়ত মাবিকতার কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী, এমনকি সহস্রাব্দ ধরে তাঁর চিন্তা ধারাবাহিকভাবে প্রাসঙ্গিক ও গ্রহণযোগ্য। এই অর্থে, গল্প ও উপাখ্যানে সমৃদ্ধ বৌদ্ধ সাহিত্যভান্ডার কেবল দৃষ্টান্ত ও ব্যাখ্যার উৎসই নয়, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে বুদ্ধকে আরও আপন করে তুলতেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বুদ্ধের এখানে-এখনবিষয়ক ভাবনাকে তাঁর পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় মত ছাড়াই বিবেচনা করার দ্বিতীয় কারণটি তাঁর ধর্মীয় চিন্তার সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত। যদিও অনেকে বুদ্ধকে অবতার ভাবেন, বুদ্ধ নিজে কখনো এমন দাবি করেননি, বরং তিনি এ ধরনের দাবি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করতেন। বুদ্ধ আসলে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়েই সংশয়ী ছিলেন। লক্ষণীয় যে বৌদ্ধধর্মই একমাত্র বিশ্বধর্ম, যা মূলত সংশয়বাদী। তবে এ সংশয় বুদ্ধের দৃশ্যমান জগতের ঊর্ধ্বে অন্বেষণ এবং ঈশ্বরের উল্লেখ ছাড়াই নৈতিক বিধানকে নীতিনির্দেশক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

বুদ্ধের চিন্তাকে বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন হিসেবে বিবেচনা করলে দেখা যায়, বুদ্ধ যে জ্ঞানতত্ত্ব অনুসরণ করেছিলেন, তা যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক যুক্তির প্রতি তাঁর গভীর নিষ্ঠা। এই যুক্তিনিষ্ঠ অনুশীলনের মধ্য দিয়েই তাঁর নৈতিকতা ও নীতিশাস্ত্র বিকশিত হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে তিনি কোনো ঐশ্বরিকতার আশ্রয় নেননি।

প্রথম কথা হলো, বুদ্ধের জ্ঞানতত্ত্ব তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাঁর সমসাময়িককালের বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে শক্তিশালী সংশয়বাদী ও নাস্তিক চিন্তাবিদদের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করেছিল। ভারতীয় বস্তুবাদী চিন্তাধারা এক দীর্ঘ ও শক্তিশালী ঐতিহ্য বহন করে। এবং তা বিশেষ করে লোকায়ত ধারা ও চার্বাক দর্শনের মাধ্যমে কালক্রমে সুসংগঠিত দর্শনব্যবস্থায় পরিণত হয়। বুদ্ধ যে ধরনের যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন, তার প্রকৃতি থেকে বোঝা যায় যে তিনি বস্তুবাদীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জগুলোকে যেমন গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করেছিলেন, তেমনি তাঁর সময়কার প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় মতগুলোর চ্যালেঞ্জও গ্রহণ করেছিলেন। সে সময়কার ধর্মগুলো পরবর্তীকালে হিন্দুধর্ম নামে পরিচিত হয়। চতুর্দশ শতকের মাধবাচার্য রচিত ‘সর্বদর্শনসংগ্রহ’-এর একটি সম্পূর্ণ অধ্যায় বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে। এ অধ্যায়ে মাধবাচার্য বৌদ্ধধর্মকে লোকায়ত ও চার্বাক দর্শনের বস্তুবাদীদের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

ব্যবহারিক যুক্তির (প্র্যাকটিক্যাল রিজন) প্রসঙ্গে আমরা দেখি যে অতীতে ব্যাপকভাবে প্রচলিত এবং আজও ব্যাপ্ত বিশ্বাস অনুসারে ঈশ্বরকে স্মরণ না করে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এই ধারণাটিকে গৌতম বুদ্ধ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। গৌতম বুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছেন, নৈতিক ধারণা নির্দিষ্ট ঐশ্বরিক সত্তা থেকে না-ও উৎসারিত হতে পারে। আজও এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল এই কারণে নয় যে পৃথিবীতে বহু অবিশ্বাসী মানুষ রয়েছে। বরং এ কারণেও যে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাস ও ধর্মের মানুষও নৈতিক আচরণবিধি নিয়ে একমত হতে পারে—যদি নৈতিকতাকে কোনো নির্দিষ্ট ঐশ্বরিক বিশ্বাসের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হিসেবে না দেখা হয়। গৌতম বুদ্ধ গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, বিভিন্ন ধারায় বিশ্বাসী মানুষদের মধ্যে যোগাযোগ হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ করলে দেখা যায়, নৈতিকতা ও নীতি সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর এই অবস্থানকে সুসংগত ও যুক্তিসম্মত করে তুলেছিল। কারণ, নৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন ঐশ্বরিক বিশ্বাসের সীমা অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছিল। অশোকসহ অধিকাংশ বৌদ্ধ শাসকের নৈতিকতা ও রাজনীতির পেছনে থাকা বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সহায়ক। এমনকি আজকের এই বিভাজন-পূর্ণ বিশ্বে এই দৃষ্টিভঙ্গি বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক।

এখন আমি বুদ্ধের পার্থিব ভাবনার কিছু মৌলিক বিষয়বস্তুর দিকে নজর দেব। এগুলো আজও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বিশেষত, আমি কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করব : (১) আলোকপ্রাপ্তি, যোগাযোগ এবং উন্মুক্ত যুক্তিবিনিময় ২. সুশাসন ও জনরাজনীতিতে মানবিক মূল্যবোধ ৩. সামাজিক চুক্তি ধারণা দ্বারা প্রভাবিত এবং সমকালীন রাজনৈতিক ও নৈতিক তত্ত্বে বহুল ব্যবহৃত চুক্তিভিত্তিক চিন্তাধারা অতিক্রমের প্রয়োজনীয়তা এবং ৪. সুবিচার ও ন্যায্যতার দাবি বোঝার ক্ষেত্রে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে একটি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির আবশ্যকতা।

যুক্তি ও যোগাযোগ প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করা যাক। পাশ্চাত্য আলোচনায় প্রায়ই মনে করা হয় যে সমস্যা সমাধানে স্পষ্ট যুক্তিনির্ভর পদ্ধতি ইউরোপীয় আলোকপ্রাপ্তির একটি বিশেষ অবদান। কিন্তু মানবেতিহাসের দীর্ঘ পরিসরে নানারূপে যুক্তির ওপরই নির্ভর করা হয়েছে। বুদ্ধ সারা জীবন অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তির ওপর নির্ভর করেছিলেন। এই প্রবণতা তাঁর প্রারম্ভিক জীবনের পরীক্ষামূলক প্রয়াসেও প্রতিফলিত হয়, যেখানে তিনি আপন অস্তিত্বগত সংকট উত্তরণের বিভিন্ন পথ খুঁজেছেন।

স্মরণ করা যেতে পারে, ‘বুদ্ধ’ নামটিও সংস্কৃত ‘বোধি’ (আলোকপ্রাপ্তি) শব্দ থেকে উদ্ভূত। তবে বুদ্ধের দৃষ্টিতে আলোকপ্রাপ্তি শুধু ব্যক্তিগত সাধনার বিষয় নয়, বরং পারস্পরিক যোগাযোগেরও বিষয়। এই যাত্রা এক যৌথ অনুসন্ধান বটে। ব্যক্তিগত আলোকপ্রাপ্তি ও সামাজিক প্রগতির জন্য উন্মুক্ত যুক্তিবিনিময়ের ওপর জোর দেওয়া বৌদ্ধ ঐতিহ্য যোগাযোগ ও যৌথ কর্মকাণ্ডের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ঘটিয়েছিল (এ ক্ষেত্রে বৌদ্ধ সংঘগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল), একই সঙ্গে বিশ্বের প্রাচীনতম উন্মুক্ত সাধারণ সভার উদাহরণও সৃষ্টি করেছিল। বিভিন্ন মতাদর্শের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত ‘বৌদ্ধ কাউন্সিল’ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন চিন্তাধারার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত হতো।

এই কাউন্সিলগুলোর প্রথমটি গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর অল্প কিছুদিন পরেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল রাজগৃহে (যা পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দার অবস্থান থেকে খুব দূরে নয়)। দ্বিতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রায় এক শতক পরে, বৈশালীতে। সর্বশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে কাশ্মীরে। তবে সবচেয়ে বৃহৎ ও সর্বাধিক সুপরিচিত ছিল তৃতীয় কাউন্সিল, যা খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সম্রাট অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় তৎকালীন ভারতের রাজধানী পাটলিপুত্রে (বর্তমান পাটনা) অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

যদিও কাউন্সিলগুলোর প্রধান লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন ধর্মীয় নীতি ও আচার-অনুশীলনের পার্থক্য ঘোচানো, তবে সেগুলো স্পষ্টভাবেই সামাজিক ও নাগরিক দায়িত্বের প্রশ্নগুলোকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করত। অধিকন্তু এ ধরনের কাউন্সিল সামগ্রিক বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে উন্মুক্ত যুক্তিবিনিময়ের ঐতিহ্য সংহত ও বিস্তৃত করতে সাহায্য করেছিল। তৃতীয় কাউন্সিল সম্রাট অশোকের পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ পরিবেশে সামাজিক আলোচনার ধারণার সঙ্গে অত্যন্ত সংগতিপূর্ণ ছিল। বিশেষভাবে নির্মিত পাথরের স্তম্ভে খোদাই করে ভারতের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা অশোকের শিলালিপিগুলোয় এর প্রমাণ আছে (কিছু শিলালিপি ভারতের বাইরেও স্থাপিত হয়েছিল)। অন্ধ্রপ্রদেশের কুর্নুল জেলার যোন্নাগিরি এলাকার এররাগুডি গ্রামে স্থাপিত ‘এরাগুড়ি এডিক্ট’ নামক শিলালিপিতে বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে: ‘ধর্মের (সঠিক আচরণ) আবশ্যকীয় উপাদানের বিকাশ নানা উপায়ে সম্ভব। কিন্তু বাকসংযম এর মূল ভিত্তি। অর্থাৎ, অসময়ে নিজ সম্প্রদায়ের অতিরিক্ত প্রশংসা করা বা অন্য সম্প্রদায়ের অবমূল্যায়ন করা থেকে বিরত থাকা।

এমনকি সুসময়েও বাকসংযত থাকা। প্রকৃতপক্ষে, সব সময়ই অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। … যদি কেউ এর বিপরীত কার্য করে, তবে সে কেবল নিজ সম্প্রদায়েরই ক্ষতি করে না, অন্যান্য সম্প্রদায়কেও আঘাত করে। কেউ যদি কেবল নিজ সম্প্রদায়কে মহিমান্বিত করার উদ্দেশ্যে অন্য সম্প্রদায়কে অবজ্ঞা করে এবং নিজ সম্প্রদায়ের প্রশংসা করে, তবে সে এই আচরণের মাধ্যমে নিজের সম্প্রদায়কেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।’

এ ধরনের পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ আলোচনার গুরুত্ব থাইল্যান্ড, চীন, কোরিয়া ও জাপানের বৌদ্ধ রচনাবলিতে সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত। কখনো কখনো তাদের শাসননীতিতেও তা প্রতিফলিত হয়েছে। ৬০৪ সালে মাতা সম্রাজ্ঞী সুইকোর প্রতিনিধি জাপানের বৌদ্ধ রাজপুত্র প্রিন্স শৌতকু উদার সংবিধান বা কেম্পো (‘সতেরো অনুচ্ছেদের সংবিধান’ নামে পরিচিত) প্রবর্তন করেছিলেন। সেখানে জনসাধারণের পরামর্শের প্রয়োজনীয়তা এবং ভিন্ন ও পরস্পরবিরোধী মতের বৈধতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। সতেরো অনুচ্ছেদের সংবিধানকে ছয় শতক পরে স্বাক্ষরিত ম্যাগনা কার্টার সঙ্গে তুলনা করা হয়। সেখানে জোর দিয়ে বলা হয়েছিল যে ‘জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়া উচিত নয়, অনেকের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করা উচিত।’ আরও বলা হয়: ‘অন্যরা আমাদের সঙ্গে মতভেদ করলে বিরক্ত হওয়া উচিত নয়, কারণ প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব মন আছে এবং প্রত্যেক মনের নিজস্ব প্রবণতা রয়েছে। তাদের কাছে যা সঠিক, আমাদের কাছে তা ভুল হতে পারে, আবার আমাদের কাছে যা সঠিক, অন্যদের কাছে তা ভুল হতে পারে।’ হাজিমে নাকামুরার মতো পণ্ডিতেরা ‘সতেরো অনুচ্ছেদের বৌদ্ধ সংবিধান’-কে জাপানে ‘গণতন্ত্র বিকাশের প্রথম পদক্ষেপ’ মে করেন। আরও সাধারণভাবে বলা যায়, গণতান্ত্রিক উন্মুক্ত যুক্তিবিনিময়ের সংস্কৃতি বিকাশে বৌদ্ধচিন্তার অবদান যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা, চিন্তার ইতিহাসে তা ততটা গুরুত্ব পায়নি।

চীনে উন্মুক্ত যুক্তিবিনিময়ের ঐতিহ্য কতটা বৌদ্ধচিন্তা প্রভাবিত, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কারণ, কনফুসীয় ঐতিহ্যই চীনের জনজীবনে খোলামেলা আলোচনার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিল। তবে বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে চীনা সমাজে উল্লেখযোগ্যভাবে মতবৈচিত্র্য বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং তা চীনে গণবিতর্ক বিস্তৃত করতে নিশ্চয় ভূমিকা রেখেছিল।

বৌদ্ধধর্মে শিক্ষা ও যোগাযোগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপের ফলেই বিশ্বের ইতিহাসে মুদ্রণপ্রযুক্তির সূচনা ঘটে। আসলে, বিশ্বের প্রারম্ভিক প্রায় সব মুদ্রণ প্রচেষ্টা—চীন, কোরিয়া ও জাপানে—বৌদ্ধ প্রযুক্তিবিদদের হাতেই শুরু হয়েছিল। তাঁদের লক্ষ্য ছিল জনসাধারণের মধ্যে জ্ঞান ও যোগাযোগ সম্প্রসারিত করা। ঘটনাক্রমে বিশ্বের প্রথম মুদ্রিত বই (অন্তত প্রথম তারিখসহ মুদ্রিত গ্রন্থ) ছিল একটি চীনা অনুবাদ গ্রন্থ। ৪০২ সালে কুমারজীব একটি ভারতীয় বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ অনুবাদ করেন, যা ‘ডায়মন্ড সূত্র’ নামে পরিচিত (সংস্কৃত: বজ্রচ্ছেদিকা প্রজ্ঞাপারমিতা)। অনুবাদটি প্রায় চার শতক পরে, ৮৬৮ সালে চীনে মুদ্রিত গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য, গ্রন্থটি চীনা ভাষায় ডজনখানেক বার অনূদিত হয়েছিল, তবে পঞ্চম শতকের প্রারম্ভে করা কুমারজীবের অনুবাদটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেটিই বিশ্বের প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। এই মুদ্রণ উদ্যোগের উদ্দেশ্য বইটির শেষাংশে উল্লেখ করা হয়েছিল এভাবে : ‘ওয়াং জিয়ে তাঁর পিতা-মাতার পক্ষ থেকে “সর্বজনীন বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য” ভক্তিভরে এটি প্রস্তুত করেছেন।’ মুদ্রণ উদ্যোগের এই যুগান্তকারী সূচনা বৌদ্ধচিন্তার পারস্পরিক যোগাযোগ এবং যৌথ শিক্ষা অর্জনের আদর্শকে মহিমান্বিত করেছে।

আজকের বিশ্বে যোগাযোগ ও উন্মুক্ত যুক্তিবিনিময়ের গুরুত্ব কোনোভাবেই অতিরঞ্জিত নয়। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটের সুদূরপ্রসারী সামাজিক প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক আলোচনার প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, ইউরোপে পর্যাপ্ত আলোচনা, সমালোচনা ও পর্যালোচনা ছাড়াই গৃহীত ‘ব্যয়সংকোচন’ কর্মসূচি অনেক ক্ষেত্রে মারাত্মক নেতিবাচক ফল বয়ে এনেছে। আরও সাধারণভাবে বলা যায়, বিশ্বায়নের সুফল ও চ্যালেঞ্জ আরও সক্রিয় ও আন্তসংযোগমূলক বৈশ্বিক পর্যালোচনা দাবি করে। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু বড় আন্তর্জাতিক নীতিগত বিপর্যয়, যেমন ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণ, স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে বহুপক্ষীয় আলোচনা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার পরীক্ষিত পথ এড়িয়ে চলার পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে উন্মুক্ত যুক্তিবিনিময় নানাভাবে আমাদের পৃথিবীকে আরও নিরাপদ ও ন্যায়সংগত করে তুলতে পারে। যোগাযোগ ও যুক্তিনির্ভর আলোচনার এই সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ধারা বিকাশে গৌতম বুদ্ধের চিন্তা এবং বৌদ্ধ ঐতিহ্যের অবদান স্বীকার করতে হবে।

Published: প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬, ০৪: ৩০

Source: https://www.prothomalo.com/onnoalo/translation/klv92qqe5g

Rate This Content

0.0/5 | 0 ratings
Not rated yet
5
0
4
0
3
0
2
0
1
0

Comments Section

Comments

0 Comments

Processing your comment...

Share Your Thoughts
Replying to
Preview
0 /2000
Pick an emoji
😀 😃 😄 😁 😅 😂 🤣 😊 😇 🙂 😉 😌 😍 🥰 😘 😗 😙 😚 🤗 🤩 🤔 🤨 😐 😑 😶 🙄 😏 😣 😥 😮 🤐 😯 😪 😫 😴 😌 😛 😜 😝 🤤 😒 😓 😔 😕 🙃 🤑 😲 ☹️ 🙁 😖 😞 😟 😤 😢 😭 😦 😧 😨 😩 🤯 😬 😰 😱 🥵 🥶 😳 🤪 😵 🥴 😠 😡 🤬 👍 👎 👌 ✌️ 🤞 🤟 🤘 🤙 👈 👉 👆 👇 ☝️ 🤚 🖐 🖖 👋 🤙 💪 🙏 ✍️ 💅 🤳 💃 🕺 👯 🧘 🏃 🚶 🧍 🧎 💻 📱 ⌨️ 🖱 🖥 💾 💿 📀 🎮 🎯 🎲 🎰 🎳 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 🎷 🎺 🎸 🎻 🎭 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 💕 ❤️ 💔 💖 💗 💓 💞 💝 💘 ❣️ 💟 🔥 💫 🌟 💥 💯 🎉 🎊 🎈 🎁 🏆 🥇 🥈 🥉 🏅 🎖
No comments yet

Be the first to share your thoughts!