আসামে বিজেপিই থাকল, পালাবদল কেরালায়

শুভজিৎ বাগচী শুভজিৎ বাগচী
Published on
2 views
2 impressions

ভারতে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এল চমকের পর চমক। পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটানোর পাশাপাশি অন্য দুই রাজ্যও সাক্ষী থাকল পালাবদলের। আসামে বিজেপিই থাকল, তবে আরও শক্তিশালী হয়ে। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পদুচেরিতে মসনদ টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে আবার সফল হলো ক্ষমতাসীন এনডিএ জোট। চারটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত পদুচেরি নিয়ে পাঁচটি বিধানসভায় গত মাসে ভোট গ্রহণ করা হয়। গতকাল সোমবার সকালে সব রাজ্যে একসঙ্গে ভোট গণনা শুরু হয়। গতকাল রাত একটায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ ফল পাওয়া না গেলেও কে জয়ী হচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। বহিরাগত জুজুই তুরুপের তাস হিমন্তের আসাম বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি এবার আঞ্চলিক জোটসঙ্গীদের ছাড়াই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ঐতিহাসিক জয়ের পথে। ১২৬টি আসনের মধ্যে একাই ৮২টিতে জয়ী বা এগিয়ে রয়েছে তারা। এই সাফল্যের প্রধান কারিগর মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা; যিনি ‘উন্নয়ন’ ও ‘সাংস্কৃতিক সুরক্ষা’র এক মিশেল ঘটিয়ে নিজেকে রাজ্যের একমাত্র ‘রক্ষাকর্তা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সফল হয়েছেন। একদিকে গত পাঁচ বছরের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্প; অন্যদিকে ‘বহিরাগত’দের হাত থেকে অসমিয়া পরিচয় রক্ষার কৌশলী প্রচার—এই দুইয়ের সমন্বয়েই তৈরি হয়েছে ‘হিমন্ত ম্যাজিক’। আসামের এক শিক্ষক সুনিত ঠাকুরের কথায়, নির্বাচনের ঠিক আগে প্রদ্যুৎ বরদলৈ ও ভূপেন কুমার বরার মতো প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতাদের বিজেপিতে শামিল করা ছিল তাঁর রাজনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক। তিনি আরও বলেন, প্রতিবারের মতোই বিজেপির প্রচারের একটি প্রধান অংশ ছিল তথাকথিত বহিরাগত ব্যক্তিদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া নিয়ে। এটিও বিজেপির পক্ষেই কাজ করেছে। বিপরীতে আসামে কংগ্রেসের ভরাডুবির মূলে রয়েছে চরম সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নেতৃত্বের অভাব। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈয়ের পরাজয় এবং বড় বড় নেতার দলত্যাগ কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিয়েছিল। পাশাপাশি ‘অসম সম্মিলিত মোর্চা’র অন্দরে আসন রফা নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং এআইইউডিএফের সঙ্গে জোটের ফলে হিন্দু ও অসমিয়া ভোটারদের একটি বড় অংশ কংগ্রেস থেকে মুখ ফিরিয়ে বিজেপির দিকে ঝোঁকে। প্রচারের ক্ষেত্রেও কংগ্রেস ভুল কৌশল অবলম্বন করে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় সমস্যাগুলোর পরিবর্তে পবন খেরা ও হিমন্তের স্ত্রীর সংঘাতের মতো অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে জড়িয়ে পড়ায় গ্রামীণ ভোটারদের সঙ্গে দলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তামিল আকাশে নতুন তারা বিজয় তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে দীর্ঘ কয়েক দশকের দ্রাবিড়ীয় আধিপত্যে ইতি টেনে এক ঐতিহাসিক উত্থান ঘটল অভিনেতা সি জোসেফ বিজয়ের (থালাপতি বিজয়) দল ‘তামিলাগা ভেত্তরি কাঝাগম’ সংক্ষেপে ‘টিভিকে’–এর। পুরোনো দল ডিএমকে ও এআইএডিএমকের মতো প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে পেছনে ফেলে জয় প্রায় নিশ্চিত করেছে নতুন এই দল। বিজয়ের এই সাফল্যের মূলে রয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং ‘বিকল্প রাজনীতি’র প্রতিশ্রুতি। প্রচারের মাধ্যমে দ্রাবিড়ীয় ভাবাদর্শকে সরাসরি আক্রমণ না করে বরং তাঁকে আধুনিক ও কার্যকর করার কথা বলেছিলেন বিজয়। এই কৌশলী অবস্থান এবং তৃণমূল স্তরে শক্তিশালী ফ্যান ক্লাবের সাংগঠনিক শক্তি তাঁর প্রচলিত প্রথা ভাঙার লড়াইয়ে গতি বাড়িয়েছে। তামিলনাড়ুতে দীর্ঘ সময় ধরে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকের পাল্টাপাল্টি শাসনে বীতশ্রদ্ধ তরুণ প্রজন্ম ও নারীরা চলচ্চিত্র তারকা বিজয়ের মধ্যে এক স্বচ্ছ ও নতুন দিশা খুঁজে পেয়েছেন। সোজা কথায়—সরাসরি তামিল জাতীয়তাবাদ এবং জনকল্যাণমূলক রাজনীতির কথা বলে সাধারণ মানুষের আবেগ ছুঁতে পেরেছে টিভিকে। পাশাপাশি ভোটের প্রচারে বারবার ঘোষিত দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং কর্মসংস্থানের আশ্বাসও ভোটারদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং সেই সূত্রে দুর্নীতি–সংক্রান্ত অসংখ্য মামলা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক স্থবিরতা; যা সাধারণের মনে ক্ষোভের দাবানল জ্বেলে দেয়। এ ছাড়া আদর্শগত পার্থক্য ছাপিয়ে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকের ক্ষমতার লড়াই প্রাধান্য পাওয়ায় এক নতুন বিকল্পের প্রতি আগ্রহী করে তোলে জনমানসকে। এই সম্মিলিত সমস্যা থেকে রেহাই পেতেই তামিলভূমে নবাগত তৃতীয় শক্তি হিসেবে বিজয়ের টিভিকেকে সাদরে আমন্ত্রণ জানাতে মুখিয়ে ওঠে জনতা জনার্দন। তবে ২৩৪ আনের তামিলনাড়ু বিধানসভায় সরকার গঠনের ‘ম্যাজিক নম্বর’ ১১৮ বিজয়ের দলও পাচ্ছে না। ১০৭টি আসনে জয় পেয়েছে তারা। ফলে মুখ্যমন্ত্রী হতে অন্য কারও মুখাপেক্ষী হতে হবে বিজয়কে। কেরালায় বাম দুর্গের পতন কেরালার রাজনীতিতে ‘বিকল্প শাসন’–এর চিরাচরিত প্রথা মেনেই পালাবদল ঘটেছে। পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন বাম জোট এলডিএফ সরকারকে সরিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ জোট। ১৪০টি আসনের মধ্যে ৮৯ আসনে জয়ী হয়েছে ইউডিএফ জোট, কংগ্রেস একাই পেয়েছে ৬৩ আসন। বিশ্লেষকদের মতে, গত ১০ বছরের বাম শাসনের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া প্রবল প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া এই পটপরিবর্তনের প্রধান কারণ। সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক দুর্নীতি, স্বজনপোষণ ও প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগ ভোটারদের বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করেছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটার এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটের মেরুকরণ ইউডিএফের পাল্লা ভারী করেছে। সেই সঙ্গে সমাজের প্রতিটি স্তরকে নিশানা করে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও রাহুল গান্ধীর নিরন্তর প্রচার এবং জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতির মিশেল ইউডিএফের পালে হাওয়া দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন নিজের দুর্গ ধর্মদমে জয়ী হলেও তাঁর মন্ত্রিসভার প্রায় ১৩ জন মন্ত্রী ধরাশায়ী হয়েছেন। এই পরাজয় এলডিএফের জন্য নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা, যা তাদের তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছে। অন্যদিকে বিজেপি চাতানুরের মতো আসনে জয়লাভ করে কেরালায় আবার নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিয়েছে। এই ফলাফল আরও একবার প্রমাণ করল যে কেরালার ভোটাররা শাসনের ধারাবাহিকতার চেয়ে পরিবর্তনকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে পরিবর্তনের দমকা বাতাস স্পর্শ করেনি পদুচেরিকে। সেখানে ৩০টি আসনের সর্বশেষ ফল অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রী এন রঙ্গস্বামীর নেতৃত্বাধীন এআইএনআরসি বিজেপির সঙ্গে জোট করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।

Published: আপডেট: ০৪ মে ২০২৬, ২০: ৩৭

Source: https://www.prothomalo.com/world/india/qyqcsd7j44

Rate This Content

0.0/5 | 0 ratings
Not rated yet
5
0
4
0
3
0
2
0
1
0

Comments Section

Comments

0 Comments

Processing your comment...

Share Your Thoughts
Replying to
Preview
0 /2000
Pick an emoji
😀 😃 😄 😁 😅 😂 🤣 😊 😇 🙂 😉 😌 😍 🥰 😘 😗 😙 😚 🤗 🤩 🤔 🤨 😐 😑 😶 🙄 😏 😣 😥 😮 🤐 😯 😪 😫 😴 😌 😛 😜 😝 🤤 😒 😓 😔 😕 🙃 🤑 😲 ☹️ 🙁 😖 😞 😟 😤 😢 😭 😦 😧 😨 😩 🤯 😬 😰 😱 🥵 🥶 😳 🤪 😵 🥴 😠 😡 🤬 👍 👎 👌 ✌️ 🤞 🤟 🤘 🤙 👈 👉 👆 👇 ☝️ 🤚 🖐 🖖 👋 🤙 💪 🙏 ✍️ 💅 🤳 💃 🕺 👯 🧘 🏃 🚶 🧍 🧎 💻 📱 ⌨️ 🖱 🖥 💾 💿 📀 🎮 🎯 🎲 🎰 🎳 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 🎷 🎺 🎸 🎻 🎭 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 💕 ❤️ 💔 💖 💗 💓 💞 💝 💘 ❣️ 💟 🔥 💫 🌟 💥 💯 🎉 🎊 🎈 🎁 🏆 🥇 🥈 🥉 🏅 🎖
No comments yet

Be the first to share your thoughts!