সৌদি–আরব আমিরাত দ্বন্দ্ব দিন দিন প্রকট হচ্ছে, এর পেছনে কারণ কী

নিউইয়র্ক টাইমস নিউইয়র্ক টাইমস
Published

ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্ত সৌদি আরবের সঙ্গে আরব আমিরাতের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের সর্বশেষ দৃষ্টান্ত।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) যখন গত সপ্তাহে ওপেকের সদস্যপদ ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিল, তখন বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারের বাইরেও এর প্রভাব পড়েছিল। আর ওপেক ছাড়ার এই সিদ্ধা্ত ছিল সৌদি আরবের সঙ্গে আরব আমিরাতের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের সর্বশেষ দৃষ্টান্ত। যদিও পারস্য উপসাগরের শক্তিধর এই দুই দেশ একসময় ঘনিষ্ঠ অংশীদার ছিল।

তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেকে ঐতিহাসিকভাবেই সৌদি আরবের প্রভাব–প্রতিপত্তি বেশি। দেশটি তার বিশাল উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। মে মাস থেকে আরব আমিরাতের ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্ত এই ইঙ্গিত দিচ্ছে, দেশটি সৌদি আরবের নেতৃত্বে পরিচালিত দীর্ঘদিনের একটি ব্যবস্থা কড়াভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

এই বিভেদ রাতারাতি তৈরি হয়নি। এক দশক আগে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও আরব আমিরাতের নেতা শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদকে আদর্শিকভাবে অভিন্ন মিত্র হিসেবে দেখা হতো। আরব বসন্তের গণজোয়ারকে তাঁরা দুজনই নিজেদের শাসনব্যবস্থার জন্য হুমকি মনে করতেন। ওই ঘটনার পর এই অঞ্চলকে নতুন করে সাজানোর প্রচেষ্টায় দুজনই ছিলেন উচ্চাভিলাষী ও একই মতের।

মোহাম্মদ বিন সালামান ও শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ একসঙ্গে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের অভিযোগ তুলে তাঁরা একসঙ্গে মিলে প্রতিবেশী দেশ কাতারকে একঘরে করার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কাতার সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। এ ছাড়া অভিন্ন আঞ্চলিক শত্রু ইরানের বিরুদ্ধেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন তাঁরা।

বর্তমানে সেই সম্পর্কের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ দুই দেশ এখন আঞ্চলিক যুদ্ধগুলোয় ক্রমেই একে অপরের বিপরীত পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে, জ্বালানি ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক কৌশল গ্রহণ করছে এবং বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগের জন্য নিজেদের মধ্যে পাল্লা দিচ্ছে।

তেল ও অর্থনীতির সংঘাত

কয়েক দশক ধরে আরব আমিরাতের দুবাই শহর ছিল মধ্যপ্রাচ্যের অর্থায়ন, লজিস্টিকস এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু ১০ বছর ধরে সৌদি আরবকে ব্যবসা ও পর্যটনের কেন্দ্রে পরিণত করতে ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। এই পরিকল্পনা সৌদি আরবকে সরাসরি আরব আমিরাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

একটি ঘোষণার মাধ্যমে সৌদি কর্মকর্তারা নিজেদের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আরও স্পষ্ট করে তোলেন। সেটি হলো—সৌদি সরকারের সঙ্গে আকর্ষণীয় চুক্তি করতে হলে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে অবশ্যই তাদের আঞ্চলিক সদর দপ্তর রিয়াদে স্থাপন করতে হবে। গত বছরের মার্চ মাসে সৌদি কর্মকর্তারা জানান, ছয় শতাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান রিয়াদে তাদের আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করেছে।

আরব আমিরাতের কর্মকর্তাদের কাছে এই বার্তা ছিল পরিষ্কার—সৌদি আরব আর কেবল তেলসম্পদ ও রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর নির্ভর করতে চায় না; বরং তারা এখন আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলোতেও সরাসরি ভাগ বসাচ্ছে।

দুই দেশই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বৈশ্বিক অবকাঠামোর মতো উদীয়মান খাতগুলোতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। এমনকি প্রায়ই তারা একই বিনিয়োগকারী ও বাজারকে লক্ষ্য করছে।

ওপেকে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব আধিপত্য বজায় রেখেছে। এ সময়ে আরব আমিরাত নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। বাড়িয়েছে তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা। দেশটির কর্মকর্তারা খোলাখুলিভাবেই হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, ওপেকের কারণে তাঁরা তাঁদের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করে মুনাফা করতে পারছেন না।

মিত্র থেকে মুখোমুখি

পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ প্রান্তে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইয়েমেন। সেখানে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের প্রকট দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০১৫ সালে ইয়েমেনে বোমা হামলা শুরু করে দুই দেশ। তাদের এই হামলার নিশানা ছিল ইরান-সমর্থিত হুতিরা। আরেকটি লক্ষ্য ছিল ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের সেই অভিন্ন লক্ষ্যেও ভাঙন ধরে। ইয়েমেনের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে সৌদি আরবের। রিয়াদ মনে করে, তাদের দেশের দক্ষিণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি ঐক্যবদ্ধ ইয়েমেন অপরিহার্য। অন্যদিকে ইয়েমেনের সঙ্গে আরব আমিরাতের কোনো সীমান্ত নেই। ফলে আমিরাত সেখানে নিজস্ব মিত্র তৈরি করেছে।

বিশেষ করে ইয়েমেনে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এসটিসি) সমর্থন দিচ্ছে আরব আমিরাত। সশস্ত্র এই গোষ্ঠী ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। এসটিসির সঙ্গে জোটের মাধ্যমে আরব আমিরাত দক্ষিণ আরব উপদ্বীপের কৌশলগত বন্দর ও জাহাজ চলাচলের পথগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে।

২০২৫ সালের শেষের দিকে দুই দেশের স্বার্থের এই ভিন্নতা সরাসরি সংঘাতে রূপ নেয়। তখন আরব আমিরাত-সমর্থিত গোষ্ঠী দক্ষিণ ও পূর্ব ইয়েমেনের সম্পদসমৃদ্ধ এলাকাগুলো দখল করে নেয়। এসব এলাকা সৌদি আরবের স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডিসেম্বরে এই সংকট চরম সীমায় পৌঁছায়। সে সময় সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী পণ্যবাহী জাহাজের ওপর হামলা চালায়। তাদের দাবি ছিল, ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য ওই জাহাজে করে অস্ত্র পাঠাচ্ছিল আরব আমিরাত।

সুদানে স্বার্থরক্ষা

পূর্ব আফ্রিকার দেশ সুদানের গৃহযুদ্ধ ঘিরেও সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের দ্বন্দ্ব চলছে। এই গৃহযুদ্ধের ফলে দেশটিতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।

২০১৯ সালে ওমর আল-বশিরের পতনের পর ৌদি আরব ও আমিরাত—দুই দেশই সুদানের রাজনৈতিক পালাবদলকে নিজেদের অনুকূলে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তাদের পথ আলাদা হয়ে যায়।

সৌদি আরব সুদানের সেনাবাহিনীকে সমর্থন দিচ্ছে। দেশটি মনে করে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রক্ষা ও বিশৃঙ্খলা রোধ করতে এই সমর্থন প্রয়োজন। সৌদি আরব মনে করে, মিসরের নিরাপত্তা ও লোহিত সাগরের শক্তির ভারসাম্যের জন্য সুদানে স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে সুদানের বিরোধী আধা সামরিক বাহিনী ‘র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে’ (আরএসএফ) সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই সমর্থনের পক্ষে প্রমাণ থাকলেও আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা তা অস্বীকার করে আসছেন।

দুই দেশের মধ্যে রেষারেষি হোয়াইট হাউস পর্যন্ত গড়িয়েছে। গত নভেম্বরে শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, সুদানে আরএসএফকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগে আরব আমিরাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন মোহাম্মদ বিন সালমান। ওই আলাপচারিতার বিষয়ে জানাশোনা আছে—এমন চারজন ব্যক্তি এ তথ্য জানিয়েছেন।

এত কিছুর পরও সৌদি আরব ও আরব আমিরাত—কোনো দেশই সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করার আগ্রহ দেখায়নি। দুই দেশের কর্মকর্তারাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন। ঐতিহাসিক সংকটের সময়ে তারা বরাবরই ঐক্যবদ্ধ থেকেছে।

সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, গত সোমবার আরব আমিরাতে ইরান হামলা চালানোর পর শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদকে ফোন করে ওই হামলার নিন্দা জানান মোহাম্মদ বিন সালমান। আরব আমিরাতের নিরাপত্তার সমর্থনে সংহতিও প্রকাশ করেন তিনি।

তবে ওপেকের সদস্যপদ ত্যাগ করার মধ্য দিয়ে এটাই বোঝা যাচ্ছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধও এই দুই নেতার মধ্যে উত্তেজনাগুলো দূরে ঠেলতে পারছে না। উপসাগরীয় এই দুই শক্তিধর দেশের টানাপোড়েন সম্ভবত আগামী বহু বছর ধরে এ অঞ্চলের গতিপথকে প্রভাবিত করবে।

Published: আপডেট: ০৬ মে ২০২৬, ০৭: ১৫

Source: https://www.prothomalo.com/world/middle-east/9mt0asatco

Rate This Content

0.0/5 | 0 ratings
Not rated yet
5
0
4
0
3
0
2
0
1
0

Comments Section

Comments

0 Comments

Processing your comment...

Share Your Thoughts
Replying to
Preview
0 /2000
Pick an emoji
😀 😃 😄 😁 😅 😂 🤣 😊 😇 🙂 😉 😌 😍 🥰 😘 😗 😙 😚 🤗 🤩 🤔 🤨 😐 😑 😶 🙄 😏 😣 😥 😮 🤐 😯 😪 😫 😴 😌 😛 😜 😝 🤤 😒 😓 😔 😕 🙃 🤑 😲 ☹️ 🙁 😖 😞 😟 😤 😢 😭 😦 😧 😨 😩 🤯 😬 😰 😱 🥵 🥶 😳 🤪 😵 🥴 😠 😡 🤬 👍 👎 👌 ✌️ 🤞 🤟 🤘 🤙 👈 👉 👆 👇 ☝️ 🤚 🖐 🖖 👋 🤙 💪 🙏 ✍️ 💅 🤳 💃 🕺 👯 🧘 🏃 🚶 🧍 🧎 💻 📱 ⌨️ 🖱 🖥 💾 💿 📀 🎮 🎯 🎲 🎰 🎳 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 🎷 🎺 🎸 🎻 🎭 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 💕 ❤️ 💔 💖 💗 💓 💞 💝 💘 ❣️ 💟 🔥 💫 🌟 💥 💯 🎉 🎊 🎈 🎁 🏆 🥇 🥈 🥉 🏅 🎖
No comments yet

Be the first to share your thoughts!