
ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তির প্রতিযোগিতায় অভিভাবকেরা অনেক সময় অযাচিত মানসিক চাপ অনুভব করেন, যা শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে শুরু হয় ভর্তির তোড়জোড়। এই সময়কে ঘিরে অনেক ক্ষেত্রে আনন্দ ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে একধরনের অদৃশ্য প্রতিযোগিতার চাপ। সন্তানকে কাঙ্ক্ষিত স্কুলে ভর্তি করানোর দৌড়ে শিশুর চেয়েও বেশি মানসিক চাপের সম্মুখীন হন অভিভাবকেরা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা মা-বাবার মানসিক প্রশান্তি নষ্ট করার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর কোমল মনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ সময় শিশুর প্রয়োজন স্থিতিশীল ঘরোয়া পরিবেশ এবং মা-বাবার নির্ভরতার সান্নিধ্য। শান্ত থাকাই যখন বড় প্রস্তুতি— ভর্তি পরীক্ষার দিনগুলোতে অভিভাবকদের শান্ত থাকা একান্ত প্রয়োজন। মা-বাবা যখন বিচলিত বোধ করেন, তখন সেই অস্থিরতা শিশুর মধ্যে সঞ্চারিত হয়। ফলে শিশু আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং নিজের স্বাভাবিক দক্ষতা প্রকাশের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই সময়ে শিশুকে পড়ার জন্য অনবরত তাগাদা না দিয়ে তার সঙ্গে বন্ধুর মতো সময় কাটানো জরুরি। প্রস্তুতির পাশাপাশি শিশুর পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ঘুম ও পুষ্টিকর খাবারের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। সন্তানের প্রস্তুতির এই সময়ে অভিভাবকদের করণীয় ও মানসিক স্বাস্থ্য কেমন হওয়া উচিত? এ বিষয়ে মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি আত্মবিশ্বাসী শিশু যেকোনো প্রতিকূলতায় ভালো করার সাহস রাখে। আর এই আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান কারিগর হচ্ছেন অভিভাবকেরা। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আমাদের অভিভাবকদের মধ্যে অনেক সময় ‘‘ডু অর ডাই’’ বা মরণপণ পরিস্থিতি তৈরির প্রবণতা দেখা যায়।’ মেখলা সরকার বলেন, প্রথমেই মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিশুর মেধা ও সীমাবদ্ধতা আলাদা। সন্তানকে কোনো নির্দিষ্ট স্কুলে ভর্তি করানোই জীবনের শেষ লক্ষ্য হতে পারে না। এই সুযোগ না হলে সামনে আরও সুযোগ আসবে—এমন ইতিবাচক মানসিকতা রাখা জরুরি। জীবনে সাফল্য ও ব্যর্থতা—উভয়ই থাকবে, এটি মেনে নেওয়ার অভ্যাস কেবল অভিভাবকদের শান্ত রাখে না, বরং শিশুর ভবিষ্যতের মানসিক ভিত্তিকেও মজবুত করে। মেখলা সরকার আরও জানান, ‘অভিভাবকেরা সব সময় সন্তানের মঙ্গল চান এবং কাঙ্ক্ষিত স্কুলে ভর্তির বিষয়ে উদ্বেগে থাকেন। কিন্তু কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠানে সুযোগ না পাওয়া মানেই ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। আবার ভর্তির পর অতিরিক্ত ভালো ফল বা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সন্তানকে ঠেলে দেওয়াও কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রতিযোগিতার চেয়ে শিশুর শিখনপ্রক্রিয়া যেন আনন্দময় হয়, সেদিকেই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।’ এ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও বড় দায়িত্ব রয়েছে বলে মনে করেন ডা. মেখলা সরকার। তিনি বলেন, সহশিক্ষা কার্যক্রমগুলো যেন কেবল জেতার নেশা বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মাধ্যম না হয়, বরং এগুলো হওয়া উচিত শিশুর জীবনদক্ষতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধির হাতিয়ার। প্রতিযোগিতার চেয়ে দক্ষতা উন্নয়ন বা স্কিল ডেভেলপমেন্টে গুরুত্ব দিলে শিশুর ওপর থেকে অহেতুক মানসিক চাপ কমে আসবে। বাসায় পড়াশোনার নিবিড় তদারকি— ইংলিশ মিডিয়ামের পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়নপদ্ধতি সাধারণ ধারার চেয়ে কিছুটা ভিন্নতর। তাই বাসায় পড়ার বিষয়টি দেখভাল করার ক্ষেত্রে মা-বাবাকে কৌশলী হতে হবে। পাঠ্যবইয়ের বিষয়গুলো যেন শিশুর কাছে ভীতিজনক না হয়ে বরং কৌতূহলোদ্দীপক হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। গৃহশিক্ষকের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে অভিভাবক সরাসরি পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত থাকলে শিশু বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। পড়ার মাঝখানে বিরতি দিয়ে তাকে ছবি আঁকা বা সৃজনশীল কাজের সুযোগ করে দিলে একঘেয়েমি দূর হয়। দূরত্ব ও যাতায়াতের ক্লান্তি: প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যে— ঢাকার প্রেক্ষাপটে বাসা থেকে স্কুলের দূরত্ব এবং দীর্ঘ যানজট শিশুর দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের অভিঘাত তৈরি করে। যাতায়াতের পথে দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়ার ফলে শিশু শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই ক্লান্তি সরাসরি তার পড়াশোনায় মনোযোগ ও সৃজনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ভর্তি পরীক্ষার জন্য স্কুল নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাই যাতায়াতব্যবস্থার সহজলভ্যতাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। স্কুলের দূরত্ব কম হলে শিশু খেলাধুলা ও নিজের মতো সময় কাটানোর সুযোগ পায়, যা তার মানসিক বিকাশে সহায়ক। স্কুল ও শিক্ষকের সঙ্গে সংযোগ— শিক্ষার্থীর সার্বিক উন্নতি কেবল পরীক্ষার খাতার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য প্রয়োজন স্কুল ও মা-বাবার মধ্যে একটি সুষম সমন্বয়। শিক্ষকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং স্কুলের বিভিন্ন কার্যক্রমে মা-বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণ শিক্ষার্থীর মনোবল বৃদ্ধি করে। এতে শিশু অনুভব করে যে তার শিক্ষার যাত্রায় পরিবার ও বিদ্যালয় একযোগে কাজ করছে। শুধু ভালো ফল নয়, বরং শিশুর মূল্যবোধ ও সামাজিক শিষ্টাচার বিকাশে শিক্ষক-অভিভাবকের এই মেলবন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষার এই পুরো সময়টিকে একটি নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধের মতো না দেখে বরং শিশুর নতুন ধাপে পদার্পণের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা প্রয়োজন। অভিভাবকদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই পারে শিশুকে একটি চাপমুক্ত ও সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে।Published: প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৭: ৫৫
Source: https://www.prothomalo.com/education/higher-education/9oncz8ekjg
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!