স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু জরুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
Published on
2 views
2 impressions

বিশ্ব শৈশব ও কৈশোর মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে এ আয়োজন করে ইউনিসেফ ও প্রথম আলো।

দক্ষ জাতি গঠনে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশে নজর দিতে হবে। পাঠ্যক্রমে স্বাস্থ্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে স্কুল পর্যায় থেকে শিশু, কিশোর–কিশোরীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করা জরুরি। পাশা���াশি শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। এতে শিশু–কিশোরদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও কমবে। ইউনিসেফ ও প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এ কথাগুলো উঠে আসে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘শিশু ও কিশোর–কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন’ শিরোনামে এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ এপ্রিল ‘বিশ্ব শৈশব ও কৈশোর মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ উপলক্ষে এ আয়োজন করা হয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক সাইফুন নাহার বলেন, একটি শিশু পৃথিবীতে আসার পর তার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সংযুক্ততা তৈরি না হলে শিশুটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে পারে। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশে শিশুর ধরন, বয়স ও আর্থসামাজিক পরিবেশ বিবেচনায় সন্তান লালন–পালন (প্যারেন্টিং) করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কৌশল ও নির্দেশিকা আরও শক্তিশালী করা, বাজেট ও চিকিৎসাঘাটতি কমানো, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ওপর জোর দেন তিনি। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক নাহিদ মাহজাবিন মোরশেদ বলেন, অভিভাবকেরা সন্তানের যত্ন নেন না, তা নয়। তবে প্যারেন্টিং একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। সন্তানকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে, যাতে তার মানসিক সমস্যা তৈরি না হয়। সন্তানকে যথাযথভাবে পালন করে সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য সহযোগিতা পেলে একটি দেশে সুস্থ ও দক���ষ জনগোষ্ঠী গড়ে ওঠে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন, এমন ব্যক্তিদের মধ্যে ৯৪ শতাংশই চিকিৎসার আওতায় থাকেন না। যথাযথ চিকিৎসার বিষয়কে সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়। এ বাজেট বাড়ানো দরকার। স্কুলে স্বাস্থ্য বলতে শুধু ভিটামিন ও কৃমির ওষুধ খাওয়ানো নয়, মানসিক স্বাস্থ্যকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক দেওয়ান মো. ইমদাদুল হক। তিনি জানান, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য রোগে ভুগছে ১৮ শতাংশের বেশি মানুষ। শিশুদের মধ্যে এ হার প্রায় ১৪ শতাংশ। ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী শিশু ও তরুণদের মধ্যে প্রায় ৫ শতাংশের আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে। বছরে ১০ থেকে ১৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করছেন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তথ্য–উপাত্তের অভাব, আলাদা প্রশিক্ষণ মডিউল না থাকা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যথাযথ সেবা না থাকা, বাজেট ঘাটতি, সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক সংস্কার, বৈষম্য ইত্যাদি। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা প্রতিরোধে শুরুতে সমস্যা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এলাকাভিত্তিক সেবা ও স্কুল পর্যায়ে সেবার ব্যবস্থা করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (স্কুল স্বাস্থ্য) আসিফ ইকবাল বলেন, সরকারের কার্যক্রমে মানসিক স্বাস্থ্য সমন্বিত অবস্থায়ই আছে। তবে সেবা মানুষের কাছে আরও যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, স্কুলে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান বিষয় র���খা হয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো পরীক্ষা নেওয়া হয় না। ফলে বিষয়টি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পড়েন কি না, সেটা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮–এ আসা কলের তথ্য তুলে ধরেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা অধিশাখার পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. সাজ্জাদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২০২৪ সালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চেয়ে শিশু–কিশোর–কিশোরীদের জন্য কল এসেছিল ৫ হাজার ৩৩০টি। এক বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে এ কলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৪০–এ। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট) মো. মনজুর হোসেন বলেন, শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বিবেচনায় রেখে প্রসবপূর্ব (এএনসি) ও প্রসবপরবর্তী সেবার (পিএনসি) ওপর জোর দেয় সরকার। পিএনসি সেবা ৪টি নিলে একজন মা বুঝতে পারেন, তাঁর কতক্ষণ ঘুমানো দরকার, কতটা পুষ্টিকর খাবার দরকার। এ জন্য পরিবারের সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক (জনস্বাস্থ্য ও তথ্যবিদ্যা বিভাগ) ফারিহা হাসিন বলেন, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য গঠনে পরিবারে অভিভাবকদের ও স্কুলে শিক্ষকদের বড় ভূমিকা রয়েছে। সামাজিক ও আবেগীয় শিক্ষার (সোশ্যাল অ্যান্ড ইমোশনাল লার্নিং) মাধ্যমে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, মানসিক চাপের সময় সিদ্ধান্ত নিতে পারা, সামাজিক সচেতনতা ও সংকট মোকাবিলায় দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তৈরি করতে হবে। স্কুল পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি তা বুঝতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে বলে মত দেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিক্ষাবিশেষজ্ঞ লায়লা ফারহানা আপনান বানু। তিনি বলেন, এটার গুরুত্ব উপলব্ধি করে শিক্ষকেরা যেন শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেন। মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা যে নষ্ট হয়, সেটা তুলে ধরে এটার গুরুত্ব নীতিনির্ধারকদের কাছেও তুলে ধরতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার হাসিনা মমতাজ বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা শুধু স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অন্যান্য মাধ্যমেও ছড়িয়ে দিতে হবে। স্কুল, বাসা ও ডিজিটাল পরিসরও যেন মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার মাধ্যম হয়ে ওঠে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ওপর জোর দেন আইসিডিডিআরবির উপপ্রকল্প সমন্বয়কারী মো. সোহেল শমীক। তিনি জানান, তাঁরা নেত্রকোনা, দিনাজপুর, চাঁদপুর ও নোয়াখালী জেলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সদর হাসপাতালের ৭টি সেন্টারে ২০২২ সালে পিন অ্যান্ড হাব মডেল তৈরি করেছেন। সেখানে মায়েরা অনলাইনে মনোরোগ–বিশেষজ্ঞদের সেবা নিতে পারেন। সেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দিলে নারীরা সেবা নিতে আগ্রহী হন। একইভাবে স্কুল স্বাস্থ্যসেবাও অনলাইনে দেওয়া যেতে পারে। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টসের সদস্যসচিব অধ্যাপক মো. নিজাম উদ্দিন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শিশু, কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নিয়াজ মোহাম্মদ খান ও একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাদিয়া আফরিন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সেলিনা ফাতেমা বিনতে শহিদ, একই হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক সিফাত–ই–সাইদ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলসেন্ট মেন্টাল হেলথের (ব্যাকহাম) মহাসচিব মো. রাহেনুল ইসলাম, মনের বন্ধুর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর��তা তৌহিদা শিরোপা এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (কিশোর–কিশোরীর স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য) সাবরিনা রাফি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

Published: প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ২১: ০৯

Source: https://www.prothomalo.com/roundtable/grbxdsjnbl

Rate This Content

0.0/5 | 0 ratings
Not rated yet
5
0
4
0
3
0
2
0
1
0

Comments Section

Comments

0 Comments

Processing your comment...

Share Your Thoughts
Replying to
Preview
0 /2000
Pick an emoji
😀 😃 😄 😁 😅 😂 🤣 😊 😇 🙂 😉 😌 😍 🥰 😘 😗 😙 😚 🤗 🤩 🤔 🤨 😐 😑 😶 🙄 😏 😣 😥 😮 🤐 😯 😪 😫 😴 😌 😛 😜 😝 🤤 😒 😓 😔 😕 🙃 🤑 😲 ☹️ 🙁 😖 😞 😟 😤 😢 😭 😦 😧 😨 😩 🤯 😬 😰 😱 🥵 🥶 😳 🤪 😵 🥴 😠 😡 🤬 👍 👎 👌 ✌️ 🤞 🤟 🤘 🤙 👈 👉 👆 👇 ☝️ 🤚 🖐 🖖 👋 🤙 💪 🙏 ✍️ 💅 🤳 💃 🕺 👯 🧘 🏃 🚶 🧍 🧎 💻 📱 ⌨️ 🖱 🖥 💾 💿 📀 🎮 🎯 🎲 🎰 🎳 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 🎷 🎺 🎸 🎻 🎭 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 💕 ❤️ 💔 💖 💗 💓 💞 💝 💘 ❣️ 💟 🔥 💫 🌟 💥 💯 🎉 🎊 🎈 🎁 🏆 🥇 🥈 🥉 🏅 🎖
No comments yet

Be the first to share your thoughts!