
ঝিনাইদহের শত শত নারী অযত্নের কচুরিপানা দিয়ে দৃষ্টিনন্দন হস্তশিল্প তৈরি করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। ঘরে বসে তৈরি পরিবেশবান্ধব এসব পণ্য বিশ্বের ৮২টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
খাল-বিলের যে কচুরিপানাকে একসময় অযত্নের আগাছা মনে করা হতো, তা দিয়েই এখন তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন নানা গৃহস্থালি পণ্য। ঝিনাইদহের গ্রামগঞ্জের শত শত নারী সংসারের কাজের ফাঁকে কচুরিপানা, ধানের খড় ও খেজুরপাতা দিয়ে তৈরি করছেন পাপোশ, ট্রে ও বাস্কেট। গ্রামীণ নারীদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি এসব পরিবেশবান্ধব পণ্য এখন রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের ৮২টি দেশে; শোভা পাচ্ছে ভিনদেশি অভিজাত পরিবারের রান্নাঘর ও বসার ঘরে। ঘরে বসে অবসরে কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন প্রায় ৮০০ নারী। নারীদের দিয়ে পণ্য তৈরির কাজটি করছে ‘বিডি ক্রিয়েশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত ফেলে দেওয়া তিনটি প্রাকৃতিক উপাদান—খেজুরের পাতা, ধানের খড় ও কচুরিপানা দিয়ে তাঁরা পণ্য তৈরি করেন। খেজুরপাতা ও ধানের খড় অন্য কাজে কিছুটা ব্যবহার হলেও কচুরিপানা ফেলে দেওয়া ছাড়া আগে কোনো উপায় ছিল না। নদী-নালা, পুকুর-জলাশয় থেকে শ্রমিক খাটিয়ে এগুলো পরিষ্কার করতে হতো। সেই আগাছাই এখন সম্পদে পরিণত হয়েছে। বিডি ক্রিয়েশনের ঝিনাইদহ অঞ্চলের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) আবদুল হামিদ জানান, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় এই কাজ শুরু হলেও ঝিনাইদহে তিনিই প্রথম উদ্যোগ নেন। শুরুতে নিজ উদ্যোগে কিছু নারীকে দিয়ে কাজ শুরু করালেও পূর্বপরিচয়ের সূত্র ধরে ২০১৮ সালের পর বিডি ক্রিয়েশন তাঁদের পাশে দাঁড়ায়। বর্তমানে জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার, কাশিমা; সদর উপজেলার কালুহাটি, কামারকুন্ডু এবং কোটচাঁদপুর উপজেলার বলাবাড়িয়া, সলেমানপুর, বলুহর, হরিণদীয়া ও মামুনশিয়া এলাকার ৮০০ নারী ৪০টি দলে বিভক্ত হয়ে নিজ বাড়িতে বসে কাজ করছেন। কাজের প্রসারের কারণে বর্তমানে ৪০ টাকা কেজি দরে তাঁদের শুকনো কচুরিপানা কিনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবদুল হামিদ। স্থানীয় লোকজন নদী থেকে কচুরিপানা তুলে শুকিয়ে তাঁদের কাছে বিক্রি করছেন। একইভাবে ধানের খড় ও খেজুরপাতাও সংগ্রহ করা হয়। শুকানোর পর এগুলো নারীদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। পণ্য তৈরির পর গাড়ি দিয়ে সংগ্রহ করে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। এরপর ক্রেতাদের পছন্দমতো ফিনিশিংয়ের কাজ শেষে সংশ্লিষ্ট দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। নারীদের দিয়ে পণ্য তৈরির কাজে যুক্ত বলুহর গ্রামের রিপন মিয়া বলেন, তাঁরা প্রথমে নারীদের প্রশিক্ষণ দেন। এরপর বাড়িতে কাঁচামাল দিয়ে আসেন। বাড়তি কোনো নিয়মনীতির প্রয়োজন পড়ে না। কাজ শেষে তৈরি করা পণ্য তাঁরা সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। সরেজমিনে জেলার তালসার গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বাড়ির বারান্দায় বসে কাজ করছেন নারীরা। বাড়ির উঠানে রোদে শুকানো হচ্ছে কচুরিপানা। গ্রামের নিখিল দাসের স্ত্রী শম্পা দেবী কচুরিপানা দিয়ে পাপোশ বুনছেন। তাঁর স্বামী পেশায় ভ্যানচালক। টিনের চালাঘর ছাড়া সহায়সম্বল কিছু নেই। একমাত্র মেয়ে বীথিকা দাসকে বিয়ে দিয়েছেন, ছেলে চণ্ডী দাস নবম শ্রেণিতে পড়ে। আগে অভাব-অনটনে সংসার চললেও এক বছর ধরে কচুরিপানার পণ্য তৈরি করে তাঁর ভাগ্য ফিরেছে। কখনো পাপোশ, কখনো ট্রে আবার কখনো বাস্কেট তৈরি করেন তিনি। শম্পা দেবী প্রথম আলোকে বলেন, সংসারের অন্য সব কাজ করে অবসর সময়ে এই কাজ করেন। দিনে ১২ থেকে ১৫টি পণ্য তৈরি করতে পারেন। প্রতিটির জন্য ২০ টাকা করে পান। গড়ে মাসে তিন হাজার টাকা আয় হয়, যা সংসারে খরচ করেন। এখন সংসারে আগের মতো অভাব নেই। কোম্পানির লোকজন কাঁচামাল দিয়ে যান, পণ্য তৈরি হলে আবার তারাই নিয়ে যান। তাঁদের শুধু তৈরি করে দিতে হয়। শম্পার মতো পিংকী দেবীও কচুরিপানা দিয়ে ট্রে তৈরি করেন। আর শিল্পী দাস তৈরি করছেন বাস্কেট। শিল্পী দাসের স্বামী সাধন দাস পেশায় নরসুন্দর। তাঁর সামান্য আয়ে পাঁচজনের সংসার চালানো বেশ কঠিন ছিল। এখন বাড়িতে বসে অবসর সময়ে কাজ করে তিনিও স্বামীকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করছেন। এতে অভাব যেমন ঘুচেছে, তেমনি পরিবারে সুখ-শান্তি ফিরেছে। এজিএম আবদুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, ফেলনা কাঁচামাল দিয়ে অনেক ধরনের শৌখিন পণ্য তৈরি হয়। তবে ঝিনাইদহে ট্রে, প্রসাধনী বাস্কেট ও পাপস—এই তিনটি পণ্য বেশি তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার পিস পণ্য বিশ্বের ৮২টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তাঁরা এটাকে শিল্প হিসেবে দেখছেন, যার সঙ্গে গ্রামের দরিদ্র পরিবারের নারীরা জড়িত। কাজের প্রসার বাড়াতে তাঁরা সদর উপজেলার নৈহাটী গ্রামে একটি কারখানা তৈরি করছেন। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সেলিনা রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এসব ক্ষুদ্র শিল্পগুলো তাঁদের কার্যক্রম বাড়াতে বিসিকের সহযোগিতা নিতে পারেন। তারা যোগাযোগ করলে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।Published: আপডেট: ০৫ মে ২০২৬, ০৬: ৫৭
Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/348qdhbgzb
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!