‘অ্যাখুন দেনা শোধ করব, না প্যাটে খাব, দিশ্যা খুঁইজ্যা পাই না’

নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
Published

ভারতের পুনর্ভবা নদী থেকে আসা পানির ঢলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে। কৃষকেরা দেনার চাপে পড়েছেন, খাদ্যসংকটের আশঙ্কা করছেন।

‘মনে আশা ছিল, ধান উঠলে পুতিনকে নতুন জামা কিন্যা দিব। অর দাদিকেও কিছু কিন্যা দিব। সামনে কুরবানির ঈদ, কুরবানি দিতে হোইবে। ধারদেনা শোধ করতে হোইবে। কিন্তু সব আশা পানিতে ডুইব্যা গেছে। ১৬ বিঘা আবাদ কইরাছিনু, ৯ বিঘাই বাদ। বাকি যেগালা ভিজা ধান পায়্যাছি। ধানার রং লষ্ট হয়্যা গেছে। আড়াই হাজার টাকাতে এক বিঘার ধান মাড়াই করছি। বিক্রি করতে পারছি না ধান। ৮০০-৯০০ টাকা দাম কহিছে। হামারঘে দুঃখের সীমা নাই। অ্যাখুন দেনা শোধ করব, না প্যাটে খাব, দিশ্যা খুঁইজ্যা পাই না।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের ঈশ্বরগঞ্জ গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত বোরোচাষি আতাউর রহমান (৭৫) বুধবার দুপুরে এভাবেই তাঁর দুঃখের কথা বলছিলেন। গ্রামের সামনে একটি ফাঁকা স্থানে তাঁর ৭ বিঘা জমির আধা শুকনা ধান মেশিনে মাড়াইয়ের কাজ চলছিল। ১০ দিন আগে হঠাৎ করে ভারতের পুনর্ভবা নদী থেকে আসা পানির ঢলে ডুবে যায় গোমস্তাপুরের বিলকুজাইন বিল। সেখানে আবাদ করা জমির অনেক ধান নষ্ট হয়েছে।

অল্প দূরে একই গ্রামের কৃষক মতিউর রহমান তাঁর স্ত্রী ও স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে মাড়াই করা ধান কুলায় উড়িয়ে পরিষ্কার করছিলেন। মতিউর জানান, তিনি ৮ বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন। ৪ বিঘার ধান কেটে নিয়ে আসতে পেরেছেন। বাকি ধান পানিতে ডুবে আছে। সেগুলো আর কেটে নিয়ে আসা সম্ভব নয়, নষ্টও হয়ে েছে। এবার চরম সংকটে পড়েছে তাঁর পরিবার।

মতিউরের স্ত্রী রেহেনা বেগম বলেন, ‘হামি ২০ বচ্ছর থ্যাকা বোহু (বউ) হয়্যা এ গাঁয়ে অ্যাসাছি। এ রকম দুর্যোগ অ্যার আগে দেখিনি। হামারঘে থ্যাকা হামার শ্বশুরের ক্ষতি বেশি। বুড়া মানুষ, শোকে মুইষড়িয়া পইড়াছে। মুখের দিকে তাকা যায় না।’

স্থানীয় লোকজন জানান, পুনর্ভবার শাখানদীর ওপর বিলকুজাইন ফেরিঘাট। এটি গঞ্জের ঘাট হিসেবে পরিচিত। ছোট শাখানদীর ওপর এলাকার কৃষকদের তৈরি কাঠের সেতুটি পানিতে তলিয়ে গেছে। এই সেতুর ওপর দিয়েই গাড়িতে করে পরিবহন করা হতো বিলের হাজার হাজার মণ ধান।

বুধবার দুপুরে ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, পানি এখনো কমেনি। মজুরের অভাব, অতিরিক্ত মজুরি ও নৌকার ভাড়া বেশি হওয়ায় অনেক চাষি ডুবে থাকা ধান কেটে আর নিয়ে আসেননি। এত দিন অনেক ধান ডুবে থেকে নষ্ট হয়ে গেছে। কষ্টে বোনা ধান হারিয়ে আতাউরের মতো কৃষকের সংখ্যা শত শত। এই বিলে ধানের ফলন বিঘাপ্রতি ৩০-৩৫ মণের কম নয়। বছরে একটি ফসল এই বোরো ধান। এই ফসলের ওপরই প্রধানত নির্ভরশীল বিলের বোরোচাষিরা। ধানকাটা হাজার হাজার খেতমজুরও মজুরি হিসেবে পাওয়া ধান দিয়ে অন্তত ছয় মাসের ভাতের খোরাক জোগান। এবার চাষি-মজুর উভয়েরই ভাতের খোরাকে টান পড়বে বলে তাঁরা জানান।

পলিথিনের নৌকা বানিয়ে তার ওপর ধান বোঝাই করে টেনে নিয়ে আসছিলেন বোরোচাষি সাদ্দাম হোসেন। ঘাটে পুনর্ভবার শাখানদীর পাড়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কোমরপানিতে ডুব্যা ধান কাইট্যা পলেথিনের নৌকা বানিয়্যা লিয়া আইনু ধান। লাভ কিছু নাই। মুখের আহার তো ফেল্যা থুইতে পারুন না।’ তিনি জানান, উজানে পাশের নওগাঁ জেলার পোরশা উপজেলারও একটি বিল ডুবে এদিকে এসেছে পানি। তাঁর ১৫ বিঘা ধানের আবাদ। তিন বিঘার ধান কাটা ছিল। সেগুলো পানিতে ভেসে গেছে। যে ধানগুলো তিনি কেটে নিয়ে আসছেন, সেগুলোর খড় গলে গেছে। আরও ৫ বিঘা ডুবে আছে। সেগুলো কাটা যাবে কি না, ঠিক নেই। তিনি বলেন, ‘আবাদ করতে যায়্যা এক লাখ টাকা দেনা হয়্যাছে। অ্যাখুন দেনা শোধ করব কী কইর‍্যা? নিজে খাব কী, আর গরু-ছাগলকেই–বা কী খাওয়াব?’

রাধানগর ইউনিয়নের রোকনপুর গ্রামের বোরোচাষি তরিকুল ইসলাম জানান, তাঁর ২০ বিঘায় ধানের আবাদ। এর মধ্যে নিজের ৫ বিঘা। বাকিটা বর্গা নেওয়া। এর মধ্যে ১৫ বিঘার ধান কাটা হয়েছে অতিরিক্ত মজুরি দিয়ে। বাকি ডুবে থাকা ধান আর অতিরিক্ত মজুরি দিয়ে কেটে নিয়ে আসবেন না। মাত্র এক বিঘার ধান বাড়িতে নিয়ে আসতে পেরেছেন। বাকি ধান বিলের উঁচু স্থানে জড়ো করা আছে। অতিরিক্ত পরিবহন খরচের জন্য নিয়ে আসতে পারেননি। ৩ লাখ টাকা ঋণ আছে তাঁর। বিলের ধান দিয়ে সারা বছরের খরচ মেটান। খরচ বাদ দিয়ে এবার অর্ধেকও জুটবে না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘পাইটেরাকে (শ্রমিকদের) কোহছি, আধটি লিয়ালে আর আধটি হামাকে দিস। তা–ও কাম করলে না, পালিয়্যা চল্যা গেল। অরাকে কদিন রাইন্ধ্যা জামাই খাওয়া কইর‍্যা খাওয়াইনু। তা–ও কাম করলে না। যত বালামুসিবত সব কৃষকের উপরে। দেনার জ্বালায় রাইতে চোখে ঘুম আসে না। আবার ভোর হোইতেই দিনভর খাটনি। আর পারি না, কৃষিকাম ছাইড়্যা দিব।’

গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাকলাইন জানান, বিল এলাকায় এবার ২ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার বিঘা জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৫০ বিঘা জমির ধান ভারত থেকে আসা ঢলের পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। এ বিষয়ে কাজ চলছে।

রাধানগর ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান মতিউর রহমান বলেন, ‘বিস্তীর্ণ বিল এলাকার হাজার হাজার বিঘার ধান ভারত থেকে আসা পানিতে ডুবেছে। এর মধ্যে কতটির সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে, তা জানা যায়নি। আমাদের বলাও হয়নি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের জন্য। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে যা বলা হচ্ছে, তা কমিয়ে বলা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, পুনর্ভবার শাখানদীটির খনন ও গঞ্জের ঘাটে একটি সেতু হলে এ সমস্যা দূর হবে। বহুদিন ধরে এলাকার কৃষকেরা এই দাবি জানিয়ে এলেও তা পূরণ করা হচ্ছে না।

Published: প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ১৫: ০১

Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/apixqsc84x

Rate This Content

0.0/5 | 0 ratings
Not rated yet
5
0
4
0
3
0
2
0
1
0

Comments Section

Comments

0 Comments

Processing your comment...

Share Your Thoughts
Replying to
Preview
0 /2000
Pick an emoji
😀 😃 😄 😁 😅 😂 🤣 😊 😇 🙂 😉 😌 😍 🥰 😘 😗 😙 😚 🤗 🤩 🤔 🤨 😐 😑 😶 🙄 😏 😣 😥 😮 🤐 😯 😪 😫 😴 😌 😛 😜 😝 🤤 😒 😓 😔 😕 🙃 🤑 😲 ☹️ 🙁 😖 😞 😟 😤 😢 😭 😦 😧 😨 😩 🤯 😬 😰 😱 🥵 🥶 😳 🤪 😵 🥴 😠 😡 🤬 👍 👎 👌 ✌️ 🤞 🤟 🤘 🤙 👈 👉 👆 👇 ☝️ 🤚 🖐 🖖 👋 🤙 💪 🙏 ✍️ 💅 🤳 💃 🕺 👯 🧘 🏃 🚶 🧍 🧎 💻 📱 ⌨️ 🖱 🖥 💾 💿 📀 🎮 🎯 🎲 🎰 🎳 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 🎷 🎺 🎸 🎻 🎭 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 💕 ❤️ 💔 💖 💗 💓 💞 💝 💘 ❣️ 💟 🔥 💫 🌟 💥 💯 🎉 🎊 🎈 🎁 🏆 🥇 🥈 🥉 🏅 🎖
No comments yet

Be the first to share your thoughts!