
যুদ্ধ বা বাণিজ্য, সব জায়গায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য। বিশ্বের বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করা, বা আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, ক্রেতার অধিকার বা মানবাধিকারের তোয়াক্কা না করে করপোরেশনের মুনাফা নিশ্চিত করতেই তারা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আবির্ভাব ঘটিয়েছিল ১৯৯৫ সালে। যদিও বিগত কয়েক দশক ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নানা আপত্তি, অনুরোধের ভিত্তিতে বেশ কিছু ‘গণতান্ত্রিক অগ্রগতি’ হয়েছিল এই প্রতিষ্ঠানটিতে। যার মধ্যে ছিল ঐকমত্য বা কনসেনসাস ও বিরোধ নিষ্পত্তিব্যবস্থার মতো কিছু ইতিবাচক চর্চা। এগুলো দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য খুব একটা কাজে না এলেও কারও মনখুশিমতো কোনো একক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না এত দিন।
ক্যামেরুনের ইয়াউন্দেতে শেষ হওয়া ১৪তম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনটি আগেরগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা রূপ নিয়ে হাজির হয়েছিল। এখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার কিছু অনুসারী নিজেদের গড়া নিয়ম ভেঙেই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) একপ্রকার অভ্যুত্থান বা ‘ক্যু’ করার চেষ্টা করেছে।
একসময় উরুগুয়ে রাউন্ডের মাধ্যমে এই দেশগুলোই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও এর নিয়মাবলি তৈরি করে। তখন তারা নিজেদের প্রয়োজনমতো বাণিজ্য ও শুল্কবিষয়ক সাধারণ চুক্তি বা গ্যাট চুক্তিকে আধুনিক রূপ দেয় এবং কৃষির মতো সংবেদনশীল খাতে নিজেদের স্বার্থে বিশেষ ছাড় নিশ্চিত করে। অথচ আজ তারাই দাবি করছে, এই নিয়ম দিয়ে আর কাজ হচ্ছে না!
উরুগুয়ে রাউন্ডের পর সময় অনেক গড়িয়েছে। ধীরে ধীরে অনেক উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশ এতে যুক্ত হয়েছে। অনেকেই কিছু সুবিধার আশ্বাসে অনেক চড়া শর্তে এতে যোগ দিয়েছে। তবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সুবিধা নিয়ে ব্যাপক উন্নতি করতে পেরেছে শুধু চীন। বর্তমানে বিশ্বের নাম্বার ওয়ান ইকোনমি চীনও যেমন ‘উন্নয়নশীল দেশ’, তেমনি দারিদ্র্যপীড়িত আফ্রিকার অনেক দেশও সংজ্ঞায়নের চক্রে পড়ে একই মানের ‘উন্নয়নশীল দেশ’। তারা এই ‘গণতান্ত্রিক’ কিন্তু একপেশে নিয়মের সংস্থার অধীনে এক মহা অসম প্রতিযোগতির সম্মুখীন হয়ে অভিযোগ করতে শুরু করেছে। এমনকি ডব্লিউটিওর সুবিধা নিয়ে চীনের এই উন্নতি যুক্তরাষ্ট্রেরও চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন নতুন সংস্কার প্রস্তাবের মাধ্যমে নতুন বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থা প্রণয়নের কথা বলছে। প্রশ্ন হলো, বিশ্বব্যাপী নাগরিকদের প্রবল প্রতিবাদের বিপরীতে গণবিমুখ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যব্যবস্থাকে এত দিন যারা সুরক্ষা দিতে মরিয়া ছিল, তারা কেন হঠাৎ এমন পরিবর্তনের জন্য উঠেপড়ে লাগল? যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে বন্ধু হয়ে ছিল, তারাও নতুন ব্যবস্থার ব্যাপারে বেশ প্রতিবাদী হয়ে উঠল।
সম্মেলন চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র রীতিমতো হুমকি দিল, তাদের প্রস্তাবমতো সংস্কার না হলে সংস্থাটিকে অদূর ভবিষ্যতে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হবে। কারণ, এটি নাকি বিশ্বের বর্তমান প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও টেকসই নয়। নতুন ব্যবস্থায় তারা ঐকমত্য প্রথা বাতিল করতে চায়, তার বদলে প্লুরিল্যাটেরালস নামে এক অদ্ভুত যৌথ পদ্ধতি চালু করতে চায়, মোস্ট ফেভারড নেশনস সীমিত করতে চায়, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নতুন সংজ্ঞার ভেতরে ফেলে তাদের সুযোগ–সুবিধা চাওয়ার জায়গা সীমাবদ্ধ করতে চায়, অভিযোগ ও বিরোধ নিষ্পত্তিব্যবস্থা তুলে দিতে চায় এবং সর্বোপরি ডব্লিউটিওকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়। মানে, এত একতরফা ব্যবস্থার মধ্যেও যেটুকু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল, সেটাও তারা নতুন সংস্কারের মাধ্যমে শেষ করে দিতে চায়।
এমন এক সময়ে এটা ঘটছে যখন যুদ্ধ ও গণহত্যা, ক্রমবর্ধমান জলবায়ু বিপর্যয়, ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ, জোরালো একতরফা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, বিপর্যস্ত সরবরাহব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে। এর কোনোটিই কিন্তু সরাসরি মূল সংস্কার এজেন্ডায় মুখ ফুটে বলা হয়নি। কিন্তু এগুলোই যে মূলত এই ক্ষমতার লড়াই পরিচালনা করছে, তা বোধগম্য।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কঠোর নিয়মাবলিতে হাঁসফাঁস করতে করতে প্রতিবাদ করতে থাকা এবং কিছু নিয়ম শিথিল করার দাবি তুলতে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তারা এত দিন ‘ব্লকার’ আখ্যা দিয়ে আসছিল। কিন্তু প্রকৃত ব্লকার ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার সমর্থকেরা। তারা দোহা রাউন্ডের উন্নয়ন প্রতিশ্রুতিগুলো বাধাগ্রস্ত করেছে, বিরোধ নিষ্পত্তিব্যবস্থা রীতিমতো পঙ্গু করে দিয়েছে, বারবার তাদের রায় মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে বা অস্বীকার করেছে, কোভিড মহামারির সময় জীবন রক্ষাকারী ভ্যাকসিন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ওপর থেকে পেটেন্ট প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করেছে, দরিদ্র কৃষক ও খাদ্যসংকটে ভুগতে থাকা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুবিধা দিতে চাওয়া কৃষিতে পাবলিক স্টকহোল্ডিং প্রস্তাব প্রায় এক যুগ ধরে আটকে রেখেছে। অথচ আজ এসে তারা বলছে, ভুগতে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিবাদই নাকি বাণিজ্যব্যবস্থার অন্তরায়।
নতুন প্রস্তাবে ঐকমত্য বা কনসেনসাস ব্যবস্থার বিপরীতে প্রস্তাব করা হয়েছে একটি প্লুরিল্যাটেরাল ব্যবস্থা। সাধারণত সব দেশ একমত না হলে কোনো একটা চুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসা যায় না। কিন্তু এই প্লুরিল্যাটেরাল ব্যবস্থাটি হলো, যারা চায় তারা একজোট হয়ে অন্যদের বাদ দিয়ে একটা সিদ্ধান্তে চলে আসতে পারবে। যাদের আপত্তি থাকবে, তারা বাদ পড়বে। ২০১৭ সালে বুয়েনস এইরেসে অনুষ্ঠিত একাদশ মন্ত্রী সম্মেলনে জয়েন্ট স্টেটমেন্ট ইনিশিয়েটিভসের মাধ্যমে এই ব্যবস্থার সূচনা হয়। অথচ কোনো বিষয়ে রাজি অল্প কিছু দেশ মিলে একটা প্রস্তাবনা পাস করিয়ে ফেলার চর্চা কনসেনসাস প্রথার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল বেশ অদ্ভুত। তারা কনসেনসাসের পক্ষেও ছিল, আবার সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্লুরিল্যাটেরালিজম ব্যবস্থায় ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশনেও তারা আগ্রহী।
নতুন এই প্রস্তাব যেসব সমস্যা তৈরি করবে তা হলো—১. এটি সব রাষ্ট্রকে সমান হিসেবে বিবেচনা করা বহুপাক্ষিকতার ভিত্তিকে দুর্বল করবে।
২. এটি ডব্লিউটিওর মূল ভিত্তি হিসেবে উন্নয়নশীল দেশ ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সম্মতিপ্রাপ্ত উরুগুয়ে রাউন্ডে গৃহীত মূল ব্যবস্থাকে অস্বীকার করবে।
৩. এটি গ্যাটের অধীনে থাকা বিভাজন পুনরায় ফিরিয়ে আনবে, যা মারাকেশ চুক্তির মাধ্যমে সমাধান করার কথা ছিল। এটি ছোট ও দরিদ্র দেশগুলোকে কেবল ‘নিয়ম পালনকারী’ স্তরে নামিয়ে দেবে, যা ডব্লিউটিওতে বিদ্যমান অসমতা আরও বাড়াবে।
৪. এটি স্বনির্বাচিত গ্রুপগুলোকে এমন সব বিষয়ে নিয়ম তৈরির লাইসেন্স দেবে, যা একটি সুষম বাণিজ্য চর্চার বিরুদ্ধে এবং এর কোনো সীমা রাখা হয়নি।
৫. এটি শক্তিশালী ��িয়ম-নির্ধারকদের পছন্দমতো বিষয় বেছে নিতে এবং তাদের স্বার্থের পরিপন্থী বিষয়গুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা দেবে।
৬. এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আরও বিভক্ত করবে। কারণ, কিছু বড় উন্নয়নশীল দেশ এসব চুক্তি থেকে সুবিধা পাবে, যা স্বল্পোন্নত দেশ, ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতি এবং ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য ক্ষতিকর হবে।
ক্যামেরুনের রাজধানী ইয়াউন্দেতে চতুর্দশ মন্ত্রী সম্মেলন শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। এখন জেনেভাতে অবস্থিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে এ নিয়ে দেনদরবার চলছে, যেখানে আশার চেয়ে আশঙ্কার পাল্লাই ভারি।
মারুফ বরকত বাণিজ্য গবেষক। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চতুর্দশ সম্মেলন, ইয়াউন্দে, ক্যামেরুনে অংশগ্রহণ করেন।
ই–মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব
Published: প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ৩৮
Source: https://www.prothomalo.com/opinion/column/rdl1sw58e0
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!