
নেত্রকোনায় টানা বৃষ্টির পর রোদ ওঠায় কৃষকেরা স্বস্তি পেয়েছেন। তাঁরা ধান শুকাতে ও কাটতে পারছেন।
কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির পর গতকাল সোমবার সকাল থেকে নেত্রকোনায় রোদের দেখা মিলেছে। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে ঝলমলে রোদ। পানিও কিছুটা কমতে শুরু করেছে। এতে হাওরাঞ্চলের কৃষকের মনে স্বস্তি ফিরেছে। অনেকেই কাটা ধান ও গবাদিপশুর জন্য খড় রাস্তায় ও আঙিনায় ত্রিপল বিছিয়ে রোদে শুকাতে দিয়েছেন। কেউ কেউ পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটছেন।
আজ দুপুরে কলমাকান্দা উপজেলার বাহাদুরকান্দা এলাকার কৃষক বাবুল হোসেন বলেন, ‘সোমবার সকাল থেকে এখন পর্যন্ত দিন ভালোই যাইতাছে। সকাল থেকে কড়া রইদ উঠছে। ভিজা কিছু ধান ও খড় সড়কে শুকাতে দিছি। এভাবে কয়েক দিন রইদ উঠলে ধান আর গরুর জন্য খড় শুকানো যাইব।’
বড়খাপন গ্রামের কৃষক জীবন সরকার বলেন, ‘গত চার দিন ভারী বৃষ্টি না থাকায় গুরাডোবা হাওরের পানি হালকা কমেছে। পরিবারের লোকজন নিয়ে পানিতে তলিয়ে যাওয়া তিন কাঠা (২৪ শতক) ধান কেটেছি। এভাবে টানা রোদ উঠলে কিছুটা হলেও আমাদের মতো কৃষকদের রক্ষা হবে।’
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার থেকে রোববার পর্যন্ত নেত্রকোনার বিভিন্ন অঞ্চলে হালকা বৃষ্টি হলেও ভারী বৃষ্টি হয়নি। এতে কংস ও উব্দাখালী নদীর পানি কমেছে। তবে ধনু নদের পানি খালিয়াজুরি পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। অবশ্য এতে বন্যার বা হাওরের ধানখেতে কোনো প্রভাব পড়বে না।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গত ৪৮ ঘণ্টায় নেত্রকোনায় ৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। আগামী দুই দিন ভারী বৃষ্টি বা বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ধনু নদের পানি বাড়ার কারণ হলো জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি ধনু নদ দিয়ে মেঘনায় প্রবাহিত হয়।
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, জেলায় আবাদ করা ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমির মধ্যে হাওরাঞ্চলে আবাদ হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে। এর মধ্যে ভারী বৃষ্টিতে ১৮ হাজার ১৭৫ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৭২ হাজার কৃষক পরিবার। তবে স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
খালিয়াজুরি উপজেলার মেন্দিপুর এলাকার কৃষক লোকমান হেকিম বলেন, হাওরে তাঁদের একমাত্র ফসলই হচ্ছে বোরো ধান। এই ধানর ওপর তাঁদের সারা বছর সংসারের খরচ নির্ভর করে। এবার অতিরিক্ত বৃষ্টিতে হাওরের অর্ধেক খেতের ধান পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। পানি আসার আগে ডিজেল–সংকটে হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা যায়নি। এরপর পানি এলে বেশি টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যায়নি।
মোহনগঞ্জের খুরশিমুল গ্রামের কৃষক আলয় সরকার বলেন, ডিঙাপোতা হাওরে অনেক ধান পানির নিচে। এখন রোদ থাকলে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
এদিকে গত রোববার সন্ধ্যায় জেলা শহরের মোক্তারপাড়া পাবলিক হলে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী সরকারিভাবে ধান–চাল ক্রয়ের উদ্বোধন করেন। তিনি বলেন, কৃষকেরা যত ইচ্ছা তত ধান গুদামে বিক্রি করতে পারবেন। কৃষকের সুবিধার্থে এবার নির্ধারিত সময়ের আগেই সরকার ধান–চাল সংগ্রহ শুরু করেছে। হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস সহায়তা দেবে সরকার। প্রয়োজনে সহযোগিতার মেয়াদ আরও বৃদ্ধি করা হবে।
জেলা খাদ্য কর্মকর্তা মোয়েতাছেমুর রহমান জানান, জেলায় ২০ হাজার ৪১৫ মেট্রিক টন বোরো ধান সংগ্রহ করা হবে। এ ছাড়া মিলারের কাছ থেকে ৫৫ হাজার ৫৮৫ মেট্রিক টন সেদ্ধ চাল এবং ২ হাজার ৩৪০ মেট্রিক টন আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে। ধান প্রতি কেজি ৩৬ আর চাল ৪৯ টাকা।
ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক আরিফুল ইসলাম সরদার বলেন, ‘দু্ই দিন ধরে রোদ ওঠায় কৃষকদের কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করার কাজ চলছে। তাঁদের সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে ঘরে তুলতে আমরা কৃষি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছি।’
Published: প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ১০: ১৩
Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/at02mctm5i
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!