
বাংলাদেশ ও সিরিয়ার মতো কিছু দেশে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও আফগানিস্তান, কঙ্গো, মিয়ানমার ও জিম্বাবুয়ের অবনতি হয়েছে। বাংলাদেশের পুষ্টিসংকট ‘মাঝারি মাত্রার’।
বাংলাদেশে গত বছর দেড় কোটির বেশি মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকটে থাকা মানুষের দুই–তৃতীয়াংশই মাত্র ১০টি দেশে কেন্দ্রীভূত, সেই তালিকায় বাংলাদেশও আছে। চলতি বছরে এসব দেশে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা কম বলেই সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। গতকাল শুক্রবার গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অ্যাগেইনস্ট ফুড ক্রাইসিস প্রকাশিত গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিসে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসংঘ, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (আইএফএডি), ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশের ১ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ ‘সংকটজনক পর্যায় ৩’–এ ও ৪০ লাখ মানুষ ‘জরুরি পর্যায় ৪’–এর খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ছিল। প্রতিবেদনে অবশ্য বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে বড় কোনো দুর্যোগ না হওয়া, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে আসা ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি। তবে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক চিত্র ভিন্ন। এ অঞ্চলে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের দুটি জেলায় আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। সম্প্রতি নতুন করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আগমন, বন্যা ও মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় তাদের খাদ্যসংকট আরও তীব্র হয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় শীর্ষে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়া রয়েছে আফগানিস্তান, কঙ্গো, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেন। বাংলাদেশ ও সিরিয়ার মতো কিছু দেশে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও আফগানিস্তান, কঙ্গো, মিয়ানমার ও জিম্বাবুয়ের অবনতি হয়েছে। বাংলাদেশকে ‘মাঝারি মাত্রার পুষ্টিসংকট’ থাকা দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৬ সাল কেমন যাবে প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালেও অনেক ক্ষেত্রে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা থাকবে। চলমান সংঘাত, জলবায়ুর অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক দেশে এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এমনকি পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। বিশেষ করে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন এখনো সময়সাপেক্ষ হলেও মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তারের কারণে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে যেখানে লাখ লাখ মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত। অনেক মানুষ ঘরে ফিরতে চায়। এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি আরও বাড়ছে। পাশাপাশি খাদ্যসংকটে থাকা দেশ ও অঞ্চলগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বৈশ্বিক কৃষি–খাদ্য বাজারে বিঘ্নের ঝুঁকির মুখে আছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্যনিরাপত্তার তাৎক্ষণিক প্রভাব মূলত আঞ্চলিক পর্যায়েই বেশি অনুভূত হচ্ছে। কেননা, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো খাদ্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে জ্বালানি ও পরিবহ��� ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আগে থেকেই ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা চাপের মুখে পড়ছে। একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো জ্বালানি ও সার রপ্তানিতে অগ্রগামী। ফলে পরিবহন যেভাবে ব্যাহত হচ্ছে, তা আরও দীর্ঘ সময় অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক কৃষি–খাদ্য বাজারে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ক্ষুধার প্রধান কারণ সংঘাত বিশ্বজুড়ে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার প্রধান চালিকা শক্তি হলো সংঘাত ও সহিংসতা। এর প্রভাবে ১৯টি দেশের ১৪ কোটি ৭৪ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সারা বিশ্বে যত মানুষ তীব্র ক্ষুধায় আক্রান্ত, এই সংখ্যা তার অর্ধেকের বেশি। এ ছাড়া চরম আবহাওয়ার কারণে ১৬টি দেশের ৮ কোটি ৭৫ লাখ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তায় বড় প্রভাব ফেলেছে। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে ১২টি দেশের ২ কোটি ৯৮ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে খাদ্যসংকটে থাকা অঞ্চলগুলোর জন্য মানবিক সহায়তা ও উন্নয়ন অর্থায়ন কমে গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সহায়তা ২০১৬–১৭ সালের পর্যায়ে নেমে এসেছে। ২০২৬ সাল সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চ পর্যন্ত আংশিক তথ্যের ভিত্তিতে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি এখনো সংকটজনক। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার হলে বৈশ্বিক কৃষি ও খাদ্য বাজারে যে বিঘ্ন ঘটবে, খাদ্যসংকটে থাকা দেশগুলো তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঝুঁকির মুখে পড়বে। অপুষ্টির শিকার একটি প্রজন্ম ২০২৫ সালে পুষ্টিসংকটে থাকা ২৩টি দেশের আনুমানিক ৩ কোটি ৫৫ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগেছে। এর মধ্যে প্রায় এক কোটির কাছাকাছি শিশু মারাত্মক পর্যায়ের তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত। এই পরিস্থিতিতে তাদের জীবন সংকটের মুখে পড়��ে পারে। এ ছাড়া আরও ২ কোটি ৫৭ লাখ শিশু মাঝারি মাত্রার তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। একই সময়ে তথ্য পাওয়া গেছে, এমন ২১টি দেশে প্রায় ৯২ লাখ অন্তঃসত্ত্বা ও দুগ্ধদানকারী নারী তীব্র অপুষ্টির শিকার হয়েছেন।Published: প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ৪৯
Source: https://www.prothomalo.com/business/economics/4bf2zegf3a
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!