
‘পরতি বছর ধান পাই ১২০ থাকি ১৩০ মণ। ইবার অর্ধেক ধান পানিতে গেছে। মনরে খালি বোঝ দিবার লাগি আধা পচা ধান কাটছি। এখন বছরের খোরাকি নিয়া চিন্তাত আছি। আমরার একবারের ক্ষতি পোষাইতে পাঁচ বছর টানতে অয়।’ হাওরের খলায় (ধানমাড়াই ও শুকানোর সমতল স্থান) স্তূপ করে রাখা আধা পাকা ধানের আঁটি দেখিয়ে এভাবেই আফসোস করছিলেন কৃষক মো. শরিয়ত উল্লাহ। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের নিয়ামতপুর গ্রামে তাঁর বাড়ি। সম্প্রতি ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওরের ধানের খেত তলিয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে তাঁর। গতকাল সোমবার দুপুরে গ্রামের পাশের জোয়ালভাঙা হাওরপারে কথা হয় শরিয়ত উল্লাহর সঙ্গে। জোয়ালভাঙা হাওরেই ৬৭ বছর বয়সী এই বৃদ্ধের সব জমি। শুধু নিয়ামতপুর নয়, এই হাওর এলাকার ১৫ থেকে ২০টি গ্রামের কৃষকদের জমি রয়েছে। খলায় অন্যদের সঙ্গে ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন শরিয়ত উল্লাহ। তাঁর কিছু ধান এখনো মাড়াই করা হয়নি। পাশেই স্তূপ করে রাখা। হাওরের বোরো ধানের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় শরিয়ত উল্লাহর পরিবারের। বাপ-দাদার হাত ধরে কৃষিকাজের শুরু। এখনো কৃষিতেই আছেন। কাজের ফাঁকে জানালেন, হাওরে এবার আট একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে সাড়ে চার একর জমির ধান কেটেছেন। বাকি সাড়ে তিন একর জমির ধান বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। যেসব জমির ধান কেটেছেন, সেগুলোও আধা পাকা ছিল বলে জানালেন এই বৃদ্ধ। তিনি বলেন, যখন পানি আসে, তখন শ্রমিক পাননি। তাই নিজে এবং গ্রামের আরও কিছু লোককে নিয়ে ‘আধিভাগিতে’ ধান কেটেছেন। সে অনুযায়ী, কাটা ধানের অর্ধেকই দিতে হয়েছে ওই লোকদের। যখন হাওরে চোখের সামনে কৃষকদের জমি তলিয়ে যাচ্ছিল, তখন এক হাজার টাকা দিয়েও শ্রমিক মেলেনি। আবার হাওরে পানি থাকায় কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিনেও ধান কাটা যায়নি। এই ধানে ভালো চাল হবে না সুনামগঞ্জে এবার মার্চের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টি শুরু হয়। এতে বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এপ্রিলের শেষ দিকে এসে শুরু হয় অতিবৃষ্টি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল। স্থানীয় কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য বলছে, বৃষ্টি আর ঢলে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের ৪২ হাজার হেক্টরের বেশি ধানখেত তলিয়ে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। হাওরের উত্তরপারে নিয়ামতপুর গ্রামের ধানের খলা। রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে হাওরের পানি দেখিয়ে শরিয়ত উল্লাহ বলেন, তাঁর যেসব জমি তলিয়েছে, সেগুলো গভীর হাওরে ছিল। কৃষকেরা ভাবতে পারেননি, এবার এত দ্রুত বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে হাওর তলাবে। অন্য বছর পানি ধীরে ধীরে আসে। এবার আগে বৃষ্টিতে হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। পরে ঢলের পানি ঢুকে ফসল তলিয়ে যায়। শরিয়ত উল্লাহ বলছিলেন, ২৫ এপ্রিল হাওরে কম পানি দেখে যান মানুষজন। পরদিন সকালে এসে দেখেন জমি তলিয়ে যাচ্ছে। আবহাওয়ার যে অবস্থা ছিল, তাতে ধান কাটা ও মাড়াই নিয়ে চরম সংকটে পড়েন তাঁরা। এরপর জমির ধান তলিয়ে যায়। কৃষকেরা ছিলেন নিরুপায়। তিনি বলেন,‘পানির তলের সব ধান পচি গিছে। এই ধান আর কাটা যাইত না। আর কাটলেও কোনো কামে আইত না।’ অতিবৃষ্টির কারণে কাটা ধান নিয়ে বিপাকে পড়া কৃষক শরিয়ত উল্লাহ জানান, এক সপ্তাহ এই ধান খলায় স্তূপ করে রাখা ছিল। ঝড়বৃষ্টি আর বজ্রপাতের হাওরে কোনো কাজ করতে পারেননি তাঁরা। রোববার রোদ ওঠায় একটা মেশিন এনে ধান মাড়াই করেছেন। এখন শুকানোর চেষ্টা করছেন। ভেজা ধান হাতে নিয়ে দেখান এই কৃষক। জানালেন, ধান ময়লা হয়ে গেছে। এগুলোতে ভালো চাল হবে না। মানে ভালো না হলে দাম কম পাওয়া যাবে। বেশি দিন স্তূপে থাকায় ধানে একধরনের গন্ধ ধরে গেছে। তাই যেখানে ৩০ শতক জমিতে ১৫ থেকে ২০ মণ ধান হওয়ার কথা, সেখানে ধান হবে ১০ থেকে ১২ মণ। খলাতেই তাঁর কাটা ধানের অর্ধেকের মতো ক্ষতি হয়েছে। ঋণের কিস্তি চালানোই দায় শরিয়ত উল্লাহর পরিবারে স্ত্রী-সন্তান মিলে ছয়জন মানুষ। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলের বয়স ২২ বছর। ছোট ছেলের বয়স ছয়। বাপ-ছেলে মিলেই জমিতে আবাদ করেন। তিনি বললেন, এবার নিজের সঞ্চয় বাদে জমি আবাদ করতে বাড়তি ২৮ হাজার টাকা ঋণ করছিলেন। এনজিওর একটি ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি আছে। বৈশাখে ধান তুলেই দেনা পরিশোধ করার কথা ছি। কিন্তু এখন ঋণ পরিশোধ তো দূরে থাক, কিস্তি চালানোই দায় হয়ে পড়েছে। বছরে শরিয়ত উল্লাহর পরিবারে খাবারের জন্য ধান দরকার হয় ৪০ থেকে ৫০ মণ। এ ছাড়া মাসে পরিবারের আনুষঙ্গিক খরচ আছে আরও কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা। প্রতিবছর নিজের ঘরের খাবার বাদে ২০ থেকে ৩০ মণ ধান বিক্রি করতেন তিনি। এবার খোরাকিই হবে কি-না, এই চিন্তায় আছেন। শরিয়ত উল্লাহর সঙ্গে কথা বলার সময় পাশে থাকা কৃষকেরা আলাপে যুক্ত হন। তাঁদেরও একই কথা। তাঁরা বললেন, হাওরে এবার যে ধানের আবাদ হয়েছিল, তার অর্ধেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাওরের এই ধানের ওপর সব নির্ভর করে তাঁদের। সংসারের পুরো এক বছরের খাওয়ার পাশাপাশি সব খরচ জোগাতে হয় ধান বিক্রি থেকে। কিন্তু এবার অনেক কৃষকের ঘরে বছরের খাবারের ধানই মিলছে না। জমি আবাদ করতে শ্রমিক, সার-বীজ, কীটনাশক, সেচসহ আনুষঙ্গিক খরচ প্রতি একরে এখন পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। এই খরচের জন্য কৃষকদের নিজের সঞ্চয় বাদে বাকিটা দেনা করতে হয়। এমনটা প্রতিবছরই করেন তাঁরা। শরিয়ত উল্লাহ এখন চিন্তা করছেন, বয়স যা–ই হোক, সংসার তো চালাতে হবে। এ জন্য শ্রমিকের কাজ করবেন। তিনি বলছিলেন, ‘বৈশাখ মাসে হাওরের খলাত যে আনন্দ থাকে, ইবার এই আনন্দ আমরার মনে নাই। সামনের বছরটাই আমরার নিরানন্দে যাইব।’
Published: আপডেট: ০৫ মে ২০২৬, ০৬: ১৩
Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/mw26tbwatp
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!