
আজকের মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি নিয়ে প্রতিযোগিতার চরিত্র বদলে গেছে। একসময় যে লড়াই তেল ও গ্যাসের ভান্ডার দখলকে ঘিরে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা ক্রমে অন্য এক স্তরে সরে এসেছে। এখনকার লড়াইয়ের লক্ষ্য জ্বালানির পথ বা রুটের ওপর নিয়ন্ত্রণ। কোন দেশ কোন পথে তার গ্যাস পাঠাবে, কে সেই পথের পরিকল্পনা করবে, আর কে সেই প্রবাহের ওপর কর্তৃত্ব রাখবে—এ প্রশ্নগুলোই আজ আঞ্চলিক শক্তির রাজনীতির কেন্দ্রে। গ্যাস পাইপলাইন একসময় ছিল নিছক প্রযুক্তিগত অবকাঠামো। প্রকৌশলীদের আঁকা নকশা, অর্থনীতিবিদদের হিসাব—এ দুইয়ের মিলিত ফল। কিন্তু আজ সেই পাইপলাইনই পরিণত হয়েছে এক জটিল ভূরাজনৈতিক অস্ত্রে। এর মাধ্যমে শুধু জ্বালানি সরবরাহই নয়; বরং প্রভাব বিস্তার, জোট গঠন, প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করা এবং পুরো আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে। এ পরিবর্তন নিছক বাহ্যিক নয়; এটি জ্বালানি কূটনীতির গভীর এক রূপান্তরকে নির্দেশ করে। এখানে প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান নয়, বন্দুকের গর্জন নেই, সীমান্তে সেনাসমাবেশ নেই। কিন্তু এই নীরব প্রতিযোগিতার প্রভাব কখনো কখনো যুদ্ধের চেয়েও সুদূরপ্রসারী। কারণ, এটি দীর্ঘমেয়াদি। এটি রাষ্ট্রগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। এ বাস্তবতায় পাইপলাইনের রুট নির্ধারণ আর কেবল ভৌগোলিক প্রশ্ন নয়। মানচিত্রে সরলরেখা টেনে পাইপ বসানো যায় না। প্রতিটি রুটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাজনৈতিক সমীকরণ, নিরাপত্তা উদ্বেগ, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বৈশ্বিক শক্তির হিসাব। ফলে পাইপলাইনের মানচিত্র আসলে একধরনের শক্তির মানচিত্র। এটি বলে দেয় কে কার সঙ্গে, কে কার বিরুদ্ধে আর কার প্রভাব কোথায় কতটা বিস্তৃত। এ প্রতিযোগিতায় ইরান, কাতার ও তুরস্ক তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। প্রত্যেকের লক্ষ্য এক হলেও পথ ভিন্ন। ইরানের কথা যদি ধরা হয়, তবে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতে তারা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ। তাত্ত্বিকভাবে ইরান খুব সহজেই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারত। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। নানা ভূরাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ইরানের সম্ভাবনাকে আটকে রেখেছে। ফলে ইরানকে শুধু সম্পদের ওপর নির্ভর না করে, রুট রাজনীতিতেও জায়গা করে নিতে হচ্ছে—যদিও তা সহজ নয়। কাতার এক ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। তারা পাইপলাইনের বদলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানিতে জোর দিয়েছে। সমুদ্রপথ তাদের প্রধান ভরসা। এর ফলে তারা রুটের ঝুঁকি অনেকটাই এড়িয়ে গেছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তারা আঞ্চলিক গ্যাস–রাজনীতিতে প্রান্তিক। বরং কাতার তাদের নমনীয় কৌশলের মাধ্যমে নিজেকে এক শক্তিশালী খেলোয়াড় হিসেবে ধরে রেখেছে। অন্যদিকে তুরস্ক একেবারে আলাদা লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। তারা নিজেকে জ্বালানি করিডরের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চায়। শুধু গ্যাস ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে নয়, বরং সরবরাহকারী ও ভোক্তার মাঝখানে এক অপরিহার্য সেতু হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই কৌশল সফল হলে তুরস্ক শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও বিরাট সুবিধা পাবে। এই তিন দেশের অবস্থান বুঝলেই স্পষ্ট হয়, আজকের লড়াইটা কেবল সম্পদের নয়, প্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণের। আর এই লড়াইকেই বলা যায় ‘রুট–যুদ্ধ’। এই যুদ্ধের কোনো দৃশ্যমান যুদ্ধক্ষেত্র নেই। কিন্তু প্রতিটি চুক্তি, প্রতিটি পাইপলাইন প্রকল্প, প্রতিটি রুট পরিবর্তনের মধ্যে লুকিয়ে থাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এখানে রাষ্ট্রগুলো এমনভাবে জ্বালানি করিডর তৈরি করতে চায়, যাতে তাদের প্রভাব বাড়ে, প্রতিপক্ষের বিকল্প কমে এবং ভবিষ্যতের বাজার তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। এই প্রতিযোগিতা জ্বালানি খাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। একটি পাইপলাইন কোথা দিয়ে যাবে, তা নির্ধারণ করে দেয় কোন দেশের সঙ্গে কার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হবে। কোন জোট শক্তিশালী হবে। কোন অঞ্চল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এমনকি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যও এতে প্রভাবিত হয়। ফলে একটি রুট নির্বাচন মানে শুধু অর্থনৈতিক হিসাব নয়; এটি একধরনের রাজনৈতিক অবস্থান। একধরনের কৌশলগত ঘোষণা। এই প্রেক্ষাপটে পাইপলাইনকে দুভাবে দেখা যায়। একদিকে এটি সংযোগ তৈরি করে। এক দেশ আরেক দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে পড়ে। ফলে সংঘাতের আশঙ্কা কমে। অন্যদিকে একই পাইপলাইন বিভাজনও তৈরি করতে পারে। কারণ, সবাই একই রুট পায় না। কেউ বাদ পড়ে। কেউ বঞ্চিত হয়। ফলে প্রতিযোগিতা বাড়ে। নতুন জোট গড়ে ওঠে। আবার পুরোনো জোট ভেঙেও যায়। মধ্যপ্রাচ্যে এই দুই প্রবণতা একসঙ্গে চলছে। কোথাও সহযোগিতা, কোথাও প্রতিযোগিতা। কোথাও সংযোগ, কোথাও বিচ্ছিন্নতা। এই দ্বৈত বাস্তবতাই অঞ্চলটিকে আরও অস্থির করে তুলছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি কূটনীতির চরিত্রও বদলে যাচ্ছে। আগে দেশগুলো কেবল উৎপাদন বাড়ানো, রপ্তানি বাড়ানো—এ নিয়েই ভাবত। এখন তারা আরও গভীরে যাচ্ছে। তারা ভাবছে কীভাবে রুট নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কীভাবে বাজার পরিচালনা করা যায় এবং কীভাবে পুরো জ্বালানিশৃঙ্খলের ওপর প্রভাব বিস্তার করা যায়। এই নতুন খেলায় যারা শুধু সম্পদের মালিক, তারা যথেষ্ট নয়। যারা সেই সম্পদ কোথায়, কীভাবে, কোন পথে যাবে—সেটা নির্ধারণ করতে পারবে, তারাই প্রকৃত শক্তিধর হয়ে উঠবে। এখানেই পাইপলাইনের নীরব যুদ্ধের তাৎপর্য। এটি কোনো তাৎক্ষণিক সংঘর্ষ নয়। এটি ধীর, কিন্তু গভীর। ড. কামরান ইয়েগানেগি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রাজনীতি ও কূটনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
Published: প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ১৪: ৫৬
Source: https://www.prothomalo.com/opinion/column/dpm86lp2rb
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!