
২০১৭ সালে ময়মনসিংহে ওয়েলফেয়ার স্কুল বিশেষ শিশুর জন্য নতুন যাত্রা শুরু করে, বর্তমানে ২২ জন শিক্ষকসহ ৬০০ শিশু সেবা পেয়েছে।
২০১৭ সালের কথা। ময়মনসিংহ শহরে ওয়েলফেয়ার স্কুল নামে একটি ভিন্নধর্মী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করেছিল। উন্নত দেশের আদলে একটি আধুনিক স্কুল গড়াই ছিল উদ্যোক্তাদের মূল লক্ষ্য। উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আধুনিক ও কোচিংমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শিশুদের পড়াশোনা, গোসল, আহার আর খেলাধুলার দায়িত্ব নিয়েছিল স্কুল কর্তৃপক্ষ। মূল লক্ষ্য ছিল একটাই, স্কুলের পর কোনো শিশুকে যেন আর প্রাইভেট পড়তে না হয়।
সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। অভিভাবকেরাও বেশ আগ্রহ নিয়ে সন্তানদের ভর্তি করাচ্ছিলেন। কিন্তু মাত্র দুই মাস পরই ঘটে এক অভাবনীয় ঘটনা। স্কুলে ভর্তি হয় উৎস নামের এক বিশেষ শিশু। তার আচরণ ছিল অন্য শিক্ষার্থীদের চেয়ে আলাদা। শিক্ষকদের কথা না মানা, সহপাঠীদের সঙ্গে মারমুখী আচরণ এবং পড়াশোনায় চরম অনাগ্রহের কারণে স্কুলের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে এক অভিভাবক ক্ষুব্ধ হয়ে তার সন্তানের ভর্তি বাতিল করে চলে যান।
শিক্ষক ও কর্মচারীরা তখন অতিষ্ঠ। তাঁরা উৎসের মা–বাবাকে ডেকে পাঠান। উৎসের মা–বাবা এলে বেরিয়ে আসে এক করুণ বাস্তবতা। জানা যায়, শিশুটি আসলে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত। তার চিকিৎসা চলছিল ভারতে। এর আগে পাঁচটি স্কুল থেকে তাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। কোথাও সে জায়গা পায়নি। এই তথ্যই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ড. মানস কান্তি সাহার চিন্তার জগৎ বদলে দিল। তিনি উপলব্ধি করেন, এই শিশুর কোনো দোষ নেই, বরং আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা তাকে ধারণ করার জন্য প্রস্তুত নয়। একদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষা, অন্যদিকে একটি অসহায় শিশুর ভবিষ্যতের দায়বদ্ধতা—এই দুইয়ের দোলাচলে পড়ে যায় স্কুল কর্তৃপক্ষ। তবে উৎসকে স্কুল থেকে বাদ দেওয়ার সহজ পথ বেছে নেননি। মানস কান্তি সাহা ময়মনসিংহের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। তিনি জানতে পারেন, দেশে অটিজম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা বা স্নায়বিক সমস্যায় ভোগা শিশুদের জন্য বিশেষায়িত ও সাশ্রয়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রচণ্ড অভাব রয়েছে। এই শিশুদের জন্য কেবল বই–খাতা নয়, প্রয়োজন সমন্বিত থেরাপি ও বিশেষ যত্ন। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন প্রচলিত স্কুল পরিচালনার চেয়ে এই অবহেলিত শিশুদের জন্য কিছু করা বেশি জরুরি।
২০১৭ সালের শেষ দিকে তিনি সাধারণ স্কুলটি বন্ধ করে দিলেন। সব সাধারণ শিক্ষার্থীকে বিদায় জানিয়ে মাত্র ২০ জন বিশেষ শিশুকে নিয়ে শুরু হলো নতুন পথচলা। শুরুতে অভিজ্ঞতা না থাকলেও ছিল অদম্য ইচ্ছা। এটি ছিল এক অনিশ্চিত যাত্রা, কারণ, বিশেষ শিশুদের লালন-পালনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা তখন তাঁদের ছিল না। তবে মানস কান্তি সাহা ও তাঁর দল দমে যায়নি। তাঁরা শিশুবিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী ধাপে ধাপে এগোতে থাকেন। দ্রুতই সুফল মিলতে শুরু করে।
আজ সেই স্কুল বিশেষ শিশুদের এক বড় আশ্রয়স্থল। এখানে শুধু অটিজম নয়, বরং শিখন দুর্বলতা ও বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় ভোগা শিশুরা সেবা পাচ্ছে। স্কুলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর টিউশন ফি। এখানে কোনো ধরাবাঁধা বেতন নেই। পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী অভিভাবকেরা নিজেরাই ফি ঠিক করেন। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পড়াশোনা, থেরাপি ও যাতায়াত খরচ স্কুল কর্তৃপক্ষই বহন করে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ২২ জন দক্ষ শিক্ষক ও ৪ জন অফিস সহকারী কাজ করছেন। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ইএমকে সেন্টারের সহায়তায় গড়ে উঠেছে একটি ভোকেশনাল ল্যাব। সেখানে কারিগরি কাজ শিখে স্বাবলম্বী হচ্ছে বিশেষ শিশুরা। এই প্রতিষ্ঠান থেকে এখন পর্যন্ত ৬০০-এর বেশি শিশু সেবা নিয়েছে। এর মধ্যে ২০০-এর বেশি শিক্ষার্থী সুস্থ হয়ে সাধারণ স্কুলগুলোতে পড়াশোনা করছে। এটিই এই স্কুলের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
ভবিষ্যতে এই শিশুদের জন্য একটি স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস গড়ার স্বপ্ন দেখছেন মানস কান্তি সাহা। যেখানে শিশুরা পাবে সব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের সমাজে বিশেষ শিশুদের পরিবারগুলো প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকে। আমরা চেয়েছিলাম এমন একটি জায়গা তৈরি করতে, যেখানে এই শিশুরা অবহেলিত হবে না। আমাদের লক্ষ্য ব্যবসায়িক নয়, বরং মানবিক। যখন দেখি যে শিশুটি আগে কথা বলতে পারত না, সে হাসিমুখে স্কুলে আসছে বা নিজের কাজ নিজে করতে পারছে—সেই তৃপ্তি পৃথিবীর অন্য যেকোনো সাফল্যের চেয়ে বড়।’
Published: আপডেট: ০৫ মে ২০২৬, ১০: ৩০
Source: https://www.prothomalo.com/education/higher-education/zdn7zdlg8f
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!