
জাপান কি যুদ্ধে যাচ্ছে, কিংবা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে? এই প্রশ্ন অনেক দিন থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছে অনেকের মনে, বিশেষ করে সেসব মানুষের মনের আয়নায়, জাপানের আধুনিক যুদ্ধসাজের প্রস্তুতির ওপর যাঁরা কিছুটা সন্দেহের চোখে নজর রাখছেন।
এ রকম সন্দেহ যে একেবারে অমূলক, তা অবশ্য বলা যায় না। কেননা, জাপানের প্রতিরক্ষা খাতের বরাদ্দ এখন পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশকেই ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি নতুন সব সমরাস্ত্র আর প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বিরাট এক ভান্ডার এখন জাপানের হস্তগত। একই সঙ্গে দেশের ক্ষমতাসীন সরকার ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে যে যুদ্ধ পরিহারের যে সংবিধান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর থেকে কার্যকর আছে, সেই সংবিধানে গুণগত বেশ কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ফলে কিছু মানুষের মনে যে প্রশ্ন এখন দেখা দিতে শুরু করেছে, তা হলো, তবে কি আবারও নতুন করে অতীতের পুরোনো পথ ধরে জাপান হাঁটতে শুরু করবে, যে পথ একসময় হিরোশিমা-নাগাসাকির ধ্বংসযজ্ঞের মতো ভয়ংকর কিছু পরিণতি দেশের জন্য নিয়ে এসেছিল।
মে মাসের ৩ তারিখ জাপানে সংবিধান দিবস। এবারের সংবিধান দিবস কেন্দ্র করে সংবিধান পরিবর্তনের পক্ষের এবং এর বিপক্ষের—উভয় পক্ষের সমর্থকেরা সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেছিলেন। সংবিধান সংস্কারের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত একটি দল ‘নিপ্পন কাইগি’র টোকিওর সমাবেশে একটি ভিডিও বার্তা পাঠান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। বর্তমানে সরকারি সফরে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করায় সমাবেশে সরাসরি উপস্থিত থাকা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সম্ভবপর হয়নি।
ভিডিও বার্তায় সানায়ে তাকাইচি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কার্যকর হওয়া জাপানের বর্তমান সংবিধান অপরিবর্তনীয় থেকে গেলেও এর গুরুত্ব যেন হ্রাস না পায়, সে জন্য সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সেই দলিল হালনাগাদ করে নেওয়া প্রয়োজন হয়ে দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত হবে আলোচনা শুরু করা।
সংবিধানে কোন ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসা দরকার, তা নিয়ে বিস্তারিত কিছু প্রধানমন্ত্রী বলেননি। তবে তাঁর সমালোচকেরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী চাইছেন সংবিধানের নবম ধারার আমূল সংস্কার করে নিতে। বিশেষ সেই ধারায় যুদ্ধ পরিহার করার পাশাপাশি দেশের জন্য সামরিক বাহিনী রাখাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ফলে সানায়ে তাকাইচির মতো রক্ষণশীল রাজনীতিকেরা মনে করছেন, দেশকে সমর বলে বলীয়ান করে তোলার পথে সংবিধানের বিশেষ এই ধারা হচ্ছে বড় এক বাধা, বর্তমান সময়ের জটিল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যা সরিয়ে ফেলা দরকার।
অন্যদিকে বিরোধী কয়েকটি রাজনৈতিক দলের আইনপ্রণেতারা সংবিধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ভিন্ন এক সমাবেশে সংবিধানের নবম ধারা বহাল রাখার পক্ষে আবেদন জানিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। এই পক্ষের বক্তারা উল্লেখ করেছেন যে সংবিধানের নবম ধারা হচ্ছে জাপানের জন্য এমন এক মূল্যবান সম্পদ, যা কেবল যুদ্ধ পরিহারের অঙ্গীকারের মধ্যে সীমিত থাকেনি, বরং একই সঙ্গে জাপানকে দেখিয়ে দিয়েছে কোন পথ ধরে অগ্রসর হলে জনকল্যাণের লক্ষ্য সত্যিকার অর্থে অর্জন করা সম্ভব।
তবে জাপানের জন্য বর্তমান এই সময় হচ্ছে প্রগতি আর শান্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন না দেখে সমর বলে বলীয়ান হয়ে দেশের কল্যাণ নিশ্চিত করার পথে যাত্রা করার সময়। সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে বামপন্থী রাজনীির ভরাডুবি কিন্তু সেই বার্তাই দিচ্ছে। ফলে সামরিক বল বাড়িয়ে অদৃশ্য শত্রুর মোকাবিলা করতে প্রস্তুতি নিয়ে রাখার বার্তা তরুণ প্রজন্মের বড় এক অংশকে আকৃষ্ট করছে এবং অজান্তেই এরা ঝুঁকে পড়ছে যুদ্ধ–প্রস্তুতির উন্মাদনার ডাকে পরোক্ষে হলেও সাড়া দিতে। এমনই এক ইঙ্গিত ইদানীং ফুটে উঠতে দেখা গেছে জাপানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর টোকিওর একটি রেজিমেন্টের জন্য নকশা করা এক লোগো বা প্রতীকে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে লোগোটির নকশা এঁকেছিলেন বাহিনীর সেই রেজিমেন্টের একজন তরুণ সদস্য। তবে সমর বল প্রদর্শনের সেই প্রতীক শেষ পর্যন্ত এতটাই সমালোচিত হতে শুরু করে যে শুরুতে সেই নকশায় সম্মতি দিলেও কোম্পানি কমান্ডার শেষ পর্যন্ত বাধ্য হন এর ব্যবহার বন্ধ করে দিতে।
Published: প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ১৩: ৫৫
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!