জ্বালানিসংকটে বাজেট যেমন হওয়া দরকার

ফাহমিদা খাতুন ফাহমিদা খাতুন
Published on
1 views
1 impressions

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আবারও প্রমাণ করেছে যে বিশ্ব অর্থনীতির একটি বড় দুর্বলতা হলো জ্বালানিনির্ভরতা। যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানিবাজার অস্থির হয়ে ওঠে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আমদানিনির্ভর জ্বালানিকাঠামো এবং সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানির ধাক্কা বাংলাদেশকে দ্রুত আঘাত করে। এই বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে শুধু বার্ষিক আয় বা ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে হবে একটি সুসংহত নীতিগত দিকনির্দেশনা, যেখানে থাকবে স্বচ্ছতা, নিয়মভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি। অর্থনীতিতে প্রথম ধাক্কাটি আসে মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, যা ধাপে ধাপে খাদ্যসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়ায়। বাংলাদেশ প্রায় তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছে, যা কখনো কখনো দুই অঙ্কও ছুঁয়েছে। যেমন ২০২৬ সালের মার্চে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। এ অবস্থায় জ্বালানির বর্ধিত দাম শুধু বর্তমান মূল্যস্ফীতিকেই বাড়াবে না, বরং ভবিষ্যতের মূল্যস্ফীতি নিয়েও মানুষের প্রত্যাশা বদলে দেবে। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ, সুদের হার বাড়ালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আমাদের বহিঃখাতের ঝুঁকিও কম নয়। বাংলাদেশ প্রায় পুরোপুরি জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এলএনজির ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেই বাণিজ্যঘাটতি বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যায় এবং টাকার মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর আগে ২০২২-২৩ সালে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের পর জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের রিজার্ভ দ্রুত কমে যায়। যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২১ সালের নভেম্বরে ৪৬ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। সে সময় আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও মুদ্রার মান সমন্বয়ের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। নতুন করে জ্বালানিসংকট তৈরি হলে একই পরিস্থিতি আবারও ফিরে আসতে পারে। জ্বালানির দাম বাড়ার আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে উৎপাদন ও বিনিয়োগে। শিল্প, কৃষি ও পরিবহন খাতে ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে ব্যবসায়ে মুনাফা কমে যায় এবং বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা হারায় প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প, উৎপাদন খাত এবং সেচনির্ভর কৃষি খাতে এর প্রভাব বেশি পড়ে। এর ফলে নতুন বিনিয়োগ কমে যায় বা পিছিয়ে যায়। ইতিমধ্যে প্রায় এক দশক ধরে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ থেকে ২৪ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি আরও কমে ২২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে জ্বালানিসংকট শুধু একটি মূল্য সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের পথেও বড় বাধা। এই পুরো পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা। বাংলাদেশের কর ও জিডিপির অনুপাত অত্যন্ত কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ। জ্বালানি ও বিদ্যুতে ভর্তুকি দিয়ে সরকার দীর্ঘদিন ধরে বাজারকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এর ফলে বাজেটের ওপর বিশাল চাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে প্রতিবছর বিপুল ভর্তুকি দিতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে এই ভর্তুকির পরিমাণ অতি দ্রুত বেড়ে যায়। সরকারকে তখন বাধ্য হয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। হয় বাজেটঘাটতি বাড়াতে হয়, নয়তো জনগণের ওপর দাম বাড়িয়ে চাপ দিতে হয়, যা শেষ পর্যন্ত আবারও মূল্যস্ফীতি বাড়ায়। এমন বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা। আগামী বাজেটের জন্য বেশ কয়েকটি বিষয়কে কৌশলগত অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে একটি স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক পদ্ধতি চালু করা দরকার। বর্তমানে হঠাৎ দাম পরিবর্তনের কারণে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ উভয়ই একধরনের অনিশ্চয়তায় ভোগেন। একটি সূত্রভিত্তিক পদ্ধতি চালু করলে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধীরে ধীরে দাম সমন্বয় করা সম্ভব হবে, যা বাজারকে অনেক বেশি স্থিতিশীল রাখবে। দ্বিতীয়ত, ভর্তুকি ব্যবস্থাকে যৌক্তিকভাবে পুনর্গঠন করতে হবে। সর্বজনীন ভর্তুকি খুবই ব্যয়বহুল। তা ছাড়া এটি উচ্চবিত্ত এবং বেশি জ্বালানি ব্যবহারকারী খাতকেই মূলত বেশি সুবিধা দেয়। এর পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি দিতে হবে। কৃষিতে সেচ খরচে সহায়তা, গণপরিবহনে ভর্তুকি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরাসরি নগদ আর্থিক সহায়তা দিলে এসব পদক্ষেপ অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। তৃতীয়ত, রাজস্ব আয় বাড়ানো ছাড়া এই সংকট টেকসইভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর প্রায়ই তাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং একটি বড় রাজনৈতিক অর্থনীতির সমস্যাও বটে। করের আওতা বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় কমানো এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে কর আদায় জোরদার করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। চতুর্থত, সরকারের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে এবং সীমিত সম্পদকে সরাসরি উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করতে হবে। জ্বালানি অবকাঠামো, পরিবহনব্যবস্থা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কারণ, এগুলোই দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। পঞ্চমত, কৌশলগত অগ্রাধিকার হতে হবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমদানিনির্ভরতা কমাতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ ব্যাপক হারে বাড়াতে হবে। বর্তমানে মোট উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অথচ দেশে সৌর ও বায়ুশক্তির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। ষষ্ঠত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করার বিকল্প নেই। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন ও বিতরণব্যবস্থায় যে বিশাল অপচয় রয়েছে, তা কমানো গেলে তাৎক্ষণিকভাবে বিপুল অর্থনৈতিক সাশ্রয় করা সম্ভব। সপ্তমত, দেশে একটি কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। অনেক দেশই স্বল্পমেয়াদি যেকোনো সংকট মোকাবিলার জন্য আপৎকালীন জ্বালানি মজুত রাখে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা এখনো অত্যন্ত সীমিত। আগামী বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ বা বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। অষ্টমত, বাজেটে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ক্রমাগত বাড়তে থাকা এই সময়ে হঠাৎ ধেয়ে আসা সংকট সামাল দেওয়ার আগাম প্রস্তুতি থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য এখন মূল বার্তাটি একদম স্পষ্ট। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কাগুলো এখন আর কোনো সাময়িক বিষয় নয়, এগুলো একেকটি স্থায়ী বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে। তাই দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিতে স্থিতিশীলতা ও সহনশীলতা গড়ে তোলা সবচেয়ে বেশি জরুরি। ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরের বাজেটকে তাই কেবল আয় ও ব্যয়ের একটি সাধারণ আর্থিক দলিল হিসেবে দেখলে চলবে না। খুবই স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্ত বা তাৎক্ষণিক কোনো চমক দেওয়া সমাধান দিয়ে বর্তমানের এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে না। এখন প্রয়োজন একটি সুসংহত, বাস্তবভিত্তিক এবং টেকসই নীতিকাঠামো তৈরি করা। ফাহমিদা খাতুন অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মতামত লেখকের নিজস্ব

Published: প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ১২: ৫৪

Source: https://www.prothomalo.com/opinion/column/lh9d97lkr5

Rate This Content

0.0/5 | 0 ratings
Not rated yet
5
0
4
0
3
0
2
0
1
0

Comments Section

Comments

0 Comments

Processing your comment...

Share Your Thoughts
Replying to
Preview
0 /2000
Pick an emoji
😀 😃 😄 😁 😅 😂 🤣 😊 😇 🙂 😉 😌 😍 🥰 😘 😗 😙 😚 🤗 🤩 🤔 🤨 😐 😑 😶 🙄 😏 😣 😥 😮 🤐 😯 😪 😫 😴 😌 😛 😜 😝 🤤 😒 😓 😔 😕 🙃 🤑 😲 ☹️ 🙁 😖 😞 😟 😤 😢 😭 😦 😧 😨 😩 🤯 😬 😰 😱 🥵 🥶 😳 🤪 😵 🥴 😠 😡 🤬 👍 👎 👌 ✌️ 🤞 🤟 🤘 🤙 👈 👉 👆 👇 ☝️ 🤚 🖐 🖖 👋 🤙 💪 🙏 ✍️ 💅 🤳 💃 🕺 👯 🧘 🏃 🚶 🧍 🧎 💻 📱 ⌨️ 🖱 🖥 💾 💿 📀 🎮 🎯 🎲 🎰 🎳 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 🎷 🎺 🎸 🎻 🎭 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 💕 ❤️ 💔 💖 💗 💓 💞 💝 💘 ❣️ 💟 🔥 💫 🌟 💥 💯 🎉 🎊 🎈 🎁 🏆 🥇 🥈 🥉 🏅 🎖
No comments yet

Be the first to share your thoughts!