রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সরকারি দলকে ইতিহাসকে ইতিহাসের জায়গায় রেখে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি শুধু এতটুকু বলব, অতীতকে স্মরণ রাখা ভালো, ইতিহাস শিক্ষা ভালো। কিন্তু ইতিহাসকে নিয়ে পড়ে থাকলে আমরা নিজেরা ইতিহাস তৈরি করতে পারব না। ইতিহাসকে ইতিহাসের জায়গায় রেখে আসুন আমরা এগিয়ে যাই।’ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রায় ৮০ ভাগ সময় ইতিহাস চর্চা হয়েছে বলে মন্তব্য করে বিরোধীদলীয় নেতা এ কথা বলেন। তিনি আজ বৃহস্পতিবার অধিবেশনে প্রায় ৪৩ মিনিট সমাপনী বক্তব্য দেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। দীর্ঘ বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং রাজধানী ও প্রান্তিক অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা দূর করতে তিনি মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার ওপর জোর দেন। এ ছাড়া সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের আহ্বান জানান। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে জনগণের অধিকার রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। শফিকুর রহমান বলেন, ‘অনেকে বলার চেষ্টা করেন আমরা সংবিধান মানি না। সংবিধান না মানলে এখানে এলাম কীভাবে। আমরা আইন মান্যকারী নাগরিক। সংবিধান পছন্দ না হলে আন্দোলন করতে পারি; বিদ্রোহ করব না।’ তিনি বলেন, গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী জামায়াত সংবিধান সংস্কারে সোচ্চার থাকলেও দলীয় প্রধানের ভাষণে তা আসেনি। বরং তিনি বিএনপিকে প্রশ্ন করেন, তারা কীভাবে বাহাত্তরের সংবিধান মানে। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘অনেকে বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতি সম্মান দেখান, আমি এটা পারি না। কারণ, এই সংবিধানকে পরিবর্তন করে গেছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাহলে কীভাবে বাহাত্তরের সংবিধান মানি?’ এই অবস্থানের কারণে বিএনপি জামায়াতকে সংবিধানবিরোধী হিসেবে দেখে বলে দাবি করে শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘অনেকে বলার চেষ্টা করে, আমরা সংবিধান মানি না। সংবিধান না মানলে এখানে আসলাম কীভাবে? আমরা আইন মান্যকারী নাগরিক। সংবিধান পছন্দ না হলে, আন্দোলন করতে পারি; বিদ্রোহ নয়।’ সমাপনী বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এই সংসদের দিকে সারা বিশ্বে থাকা বাংলাদেশিরা তাকিয়ে রয়েছেন। বিপুল প্রত্যাশা এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে এসেছি সবাই।’ জামায়াতকে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা ‘পাকিস্তানপন্থী’ বলে যে খোঁচা দেন—এ নিয়েও কথা বলেন তিনি। জামায়াত আমিরের আগে বক্তৃতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উর্দু কবিতা আবৃত্তি এবং উর্দু শব্দ ব্যবহারের প্রতি ইঙ্গিত করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, ‘এখন তো সবাই ইংরেজি চর্চা করে। কিন্তু সংসদে এসে দেখি উর্দু হয়ে গেছি। সরকারি দলের কাছ শেখার চেষ্টা করছি।’ বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ক্ষমতায় যখন থাকেন, তখন নিজেকে সবাই ফেরেশতা মনে করেন। অন্যদের দোষ দেখেন। অন্যের দোষের তালিকা তৈরি করা খুব সহজ। ১২ মার্চ থেকে সরকারি দলের বক্তব্যের ৮০ ভাগ হচ্ছে ইতিহাসচর্চা। তিনি বলেন, ‘১৯৪৭ সালকে আমি সম্মান করি। কারণ, সেই সময়েই এই সীমানা, ভূখণ্ড পেয়েছিলাম।’ সাতচল্লিশের প্রতি সম্মানের কারণে সরকারি দলের সমালোচনার বিষয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ইতিহাস নিয়ে ‘কোপাকুপির’ পর সরকারি দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা এসে বলেন, ‘আসুন, আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। অতীতকে স্মরণ রাখা ভালো। ইতিহাস শিক্ষা ভালো। কিন্তু ইতিহাস নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না। তাহলে ইতিহাস তৈরি করতে পারব না।’ তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রস্তাব সরকার কৃষকের প্রতি মনোযোগ দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘কৃষকেরা মধ্যস্বত্বভোগীর যন্ত্রণায় রয়েছেন। গ্রামে ১০ টাকায় বিক্রি করা ফসল, ঢাকায় ৪০ টাকায় বিক্রি করা হয়। কৃষক কি ন্যূনতম দামের জন্য সরকার থেকে এটুকু সমর্থন পেতে পারে না?’ আওয়ামী লীগ শাসনামলে চীন তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণে অর্থায়নের প্রস্তাব করে। পরে এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখায় ভারত। এতে বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পটি ঝুলে যায়। সরকারের তরফে বলা হয়েছিল, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গে খরা এবং বন্যার সমস্যা মিটবে। জামায়াত নির্বাচনী প্রচারে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে। দলটির অবস্থান হলো, চীনের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন। ভারতের প্রতি ইঙ্গিত করে জামায়াত আমির বলেন, ‘কারও চোখ রাঙানিতে ভয় পাই না। সরকার যদি সাহস করে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করে, ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত সমর্থন করবে। অন্তত আমি থাকব।’ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে প্রশ্ন ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা। ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুদ্ধ একদিন শেষ হয়ে য���বে, কিন্তু দুঃসময়ে দেশটির পাশে কারা কারা ছিল, তা মনে রাখা হবে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার ঘটনায় জামায়াত আমির ছাড়া আর কেউ শোক প্রকাশ করেনি। ইরানে স্কুলে হামলা করে ১৪২ শিশুকে হত্যায় বাংলাদেশ সরকারের তরফে কেউ শোক জানাতে আসেনি। এই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, ‘আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র কেন বলে, “চরম দুঃখের সময়ে বাংলাদেশকে পাশে পাইনি।” কেন এমন হলো?’ তিনি সরকারের পররাষ্ট্রনীতি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘যে মজলুম, তার পক্ষে থাকব। অন্যায়ের প্রতিবাদ করব। তবে নিজের ভাষায় করব। কারও শিখিয়ে দেওয়া ভাষায় নয়। আমাদের অনেক বন্ধু দরকার, প্রভু দরকার নেই।’ আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির সখ্য বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে বলা হয়, এমন কিছু করবেন না, যাতে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসে। কিন্তু নির্বাচনের আগে ট্রেজারি বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ নেতারা বলেছিলেন, তোমাদের জন্য দুয়ার খোলা। সব মামলা তুলে নেওয়া হবে। সেই সমঝোতা কি এখনো আছে?’ জামায়াত আমির বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের সময়ের সব অপরাধের বিচার হতে হবে। ওসমান হাদির হত্যার বিচার পর্যন্ত তা আসতে হবে। যে গুম, খুন, ধর্ষণ হয়েছে, তার বিচার হতে হবে। নইলে তাদের আত্মার অভিশাপ নিতে হবে এই সংসদকে। আমরা এখানে বিরোধী দলকে প্রতিনিধিত্ব করতে আসিনি। মানুষের প্রতিনিধিত্ব করি।’ চরিত্রহননের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার দাবি বিরোধীদলীয় নেতার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তৃতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল ছবি দিয়ে মিথ্যা প্রচারের বিষয়টি আনেন। বিরোধীদলীয় নেতা এই অপপ্রচারের শাস্তি দাবি করেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পরিবারকে নিয়ে যারা অশ্লীলতা করেছে, তাদের বিচার চাই। প্রধানমন্ত্রী বিচার না চাইলেও আমি বিচার চাই। প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে আমাদেরও মেয়ে।’ তিনি ‘দোষারোপের রাজনীতি করতে চাই না’ উল্লেখ করে বলেন, নির্মোহভাবে দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করুন। দলীয়করণ, চাঁদাবাজি, হানাহানির অভিযোগ বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘সারা দেশে সীমাহীন চাঁদাবাজি চলছে। আধিপত্য বিস্তারের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে অনেক মানুষ মারা গেছেন। যে সরকারই ক্ষমতায় আসে, তারা বলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো। কিন্তু “আগের চেয়ে ভালো” যে কী, তা বুঝি না। যেসব জায়গায় আইনশৃঙ্খলা নাজুক, সেখানে যেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নজর দেন।’ জামায়াত আমির বলেন, ‘শিক্ষাঙ্গনে আর সন্ত্রাস চাই না। যে দলেরই হোক, কেউ কোপের বা গুলি শিকার না হোক।’ প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত ঠিক করতে হবে। শিক্ষা খাতে গবেষণা থাকতে হবে। কিন্তু গবেষণার নামে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা ফকিরের ভিক্ষা। তবে কৃষি খাতে গবেষকেরা ভালো করেছেন। তাঁদের কৃতিত্ব স্বীকার করতে হবে। আগামী বাজেটে সর্বাধিক গুরুত্ব যেন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে দেওয়া হয়। সরকারি চাকরির বদলি–পদায়নে দলীয়করণের অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মেধাভিত্তিক সমাজ হবে। কিন্তু দল থেকে পদ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি ও বিরোধী দলের ঐক্য কাজ করে বলে দাবি করেন জামায়াত আমির। জ্বালানিসংকটের উদাহরণ দিয়ে জামায়াত আমির বলেছেন, আগে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন ছিল। সংসদে আলোচনা এবং কমিটি গঠনের পর সেই লাইন আর নেই। মানে মানুষ আস্থা পাচ্ছে। বিরোধীদলীয় নেতা নি��� নির্বাচনী এলাকা-১৫ আসনের খাল দখল, ভাঙাচোরা সড়ক, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বেহাল অবস্থা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সমাধান চান।

Published: প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭: ০৮

Source: https://www.prothomalo.com/politics/2maa3h6kfa

Rate This Content

0.0/5 | 0 ratings
Not rated yet
5
0
4
0
3
0
2
0
1
0

Comments Section

Comments

0 Comments

Processing your comment...

Share Your Thoughts
Replying to
Preview
0 /2000
Pick an emoji
😀 😃 😄 😁 😅 😂 🤣 😊 😇 🙂 😉 😌 😍 🥰 😘 😗 😙 😚 🤗 🤩 🤔 🤨 😐 😑 😶 🙄 😏 😣 😥 😮 🤐 😯 😪 😫 😴 😌 😛 😜 😝 🤤 😒 😓 😔 😕 🙃 🤑 😲 ☹️ 🙁 😖 😞 😟 😤 😢 😭 😦 😧 😨 😩 🤯 😬 😰 😱 🥵 🥶 😳 🤪 😵 🥴 😠 😡 🤬 👍 👎 👌 ✌️ 🤞 🤟 🤘 🤙 👈 👉 👆 👇 ☝️ 🤚 🖐 🖖 👋 🤙 💪 🙏 ✍️ 💅 🤳 💃 🕺 👯 🧘 🏃 🚶 🧍 🧎 💻 📱 ⌨️ 🖱 🖥 💾 💿 📀 🎮 🎯 🎲 🎰 🎳 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 🎷 🎺 🎸 🎻 🎭 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 💕 ❤️ 💔 💖 💗 💓 💞 💝 💘 ❣️ 💟 🔥 💫 🌟 💥 💯 🎉 🎊 🎈 🎁 🏆 🥇 🥈 🥉 🏅 🎖
No comments yet

Be the first to share your thoughts!