
দেশে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ রোধে সন্তান নিতে ইচ্ছুক নারীদেরও হামের টিকা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ভাইরাস, টিকা ও স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, গর্ভধারণের এক থেকে দুই মাস আগে এ টিকা দিতে হবে। হামের পাশাপাশি রুবেলার টিকা দেওয়াও প্রয়োজন।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে গত দেড় মাসে একের পর এক শিশুর মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে যখন জরুরি ভিত্তিতে সরকার টিকাদানের কর্মসূচি নিয়েছে, তখন সম্ভাব্য সন্তানসম্ভবাদেরও টিকার আওতায় আনার পরামর্শ এল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হামের দুই ডোজের প্রথমটি দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে। আর দ্বিতীয়টি দেওয়া হয় ১৫ মাসে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ছয় মাস বয়সী শিশুরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে। অর্থাৎ মায়ের শরীরে থাকা অ্যান্টিবডি হয়তো পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে পারছে না। তাই সন্তান ধারণের আগেই মায়ের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নিশ্চিত করা গেলে নবজাতক ও অল্পবয়সী শিশুদের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
তবে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মত দিয়েছেন কেউ কেউ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, যদি জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপ (নাইট্যাগ) পরামর্শ দেয়, তবেই তারা সম্ভাব্য সন্তানসম্ভবাদের টিকার আওতায় আনতে পারেন।
বাংলাদেশ যখন হাম নির্মূলের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই দেখা দিয়েছে এই রোগের প্রাদুর্ভাব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৩৬ হাজার রোগী পাওয়া গেছে, যাদের হামের উপসর্গ রয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষা করে পাঁচ হাজার জনের হামে আক্রান্ত হওয়া নিশ্চিত হওয়া গেছে। হামে আক্রান্তদের মধ্যে ৪৭ জন মারা গেছে। এ ছাড়া ২২৭ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপসর্গ যাদের ছিল, তারাও হামে আক্রান্ত বলেই ধরে নেওয়া যায়। বাংলাদেশে গত দুই দশকে হামে এত মৃত্যুর রেকর্ড নেই।
হামে আক্রান্ত ও মৃতদের অধিকাংশই শিশু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত সপ্তাহে বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রতিবেদনে বলেছে, আক্রান্তদের মধ্যে ৭৯ শতাংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এর মধ্যে দুই বছরের কম বয়সী শিশু ৬৬ শতাংশ এবং ৯ মাসের কম বয়সী শিশু ৩৩ শতাংশ।
দুই বছরের নিচে মারা যাওয়া শিশুদের অধিকাংশ হামের টিকা পায়নি বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ২০২৪–২৫ সালে বাংলাদেশে টিকাদানে ঘাটতির বিষয়টিও তুলে ধরে জাতিসংঘের সংস্থাটি।
এরপর বর্তমান সরকার জরুরি ভিত্তিতে শিশুদের হামের টিকাদানের কর্মসূচি নিয়েছে। বিশেষ এ কর্মসূচিতে আগামী ২০ মের মধ্যে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হচ্ছে।
গর্ভধারণে ইচ্ছুকদের কেন প্রয়োজন
গর্ভধারণে ইচ্ছুক নারীদের টিকা দেওয়ার কারণ জানতে গেলে আগে জানতে হবে, ৯ মাস বয়সী শিশুদের কেন হামের টিকা দেওয়া হয়, আগে নয় কেন? এর উত্তরে বিশিষ্ট ভাইরাসবিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাবেক বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা ধরে নেওয়া হতো যে মায়ের শরীরে থাকা অ্যান্টবডি শিশুর শরীরে কাজ করবে। আগে ধারণা ছিল, মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুকে কয়েক মাস সুরক্ষা দেয়। কিন্তু এখন বাস্তবে আমরা দেখছি, অনেক ক্ষেত্রেই এই সুরক্ষা যথেষ্ট নয়।’
এর কারণ হিসেবে আবার পুষ্টির সমস্যা এবং বুকের দুধ না পান করানোর কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।
গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মস��চির ক্ষেত্রে বড় ধরনের গাফিলতির কারণে এখন হামের টিকা বিবাহিত ও সন্তান নিতে ইচ্ছুক নারীদের দেওয়া প্রয়োজন বলে মত দেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।
নজরুল ইসলাম বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। একবার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত অনেক শিশুর মধ্যে ছড়াতে পারে। গর্ভধারণের আগে নারীদের টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে শিশুর জন্মের পর হাম থেকে প্রাথমিক সুরক্ষা জোরদার হতে পারে।
তবে কেউ গর্ভধারণ করে ফেললে কোনোভাবেই আর হামের টিকা দেওয়া যাবে না, এই কথায় একমত সব বিশেষজ্ঞই।
টিকাবিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে ব্যবহৃত হামের টিকা (এমএমআর বা এমআর) একটি ‘লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড ভ্যাকসিন’। তাই এটি গর্ভাবস্থায় দেওয়া হয় না। কেবল গর্ভধারণের এক থেকে দুই–তিন মাস আগে এ টিকা নেওয়া যেতে পারে।
গর্ভধারণে ইচ্ছুকদের টিকাদানের পক্ষে মত দিয়ে তিনি বলেন, ‘যাঁরা মা হতে চান, তাঁরা যদি আগে থেকেই টিকা নিয়ে নেন, তাহলে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় এবং সেটি শিশুর মধ্যেও কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।’
জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি প্রজননক্ষম নারীদের টিকা দেওয়ার বিষয়টি এখন গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার পরামর্শ দেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ সতর্ক করে বলেছেন, এ বিষয়ে দেশে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে, মায়ের টিকাদান কতটা কার্যকরভাবে শিশুর সুরক্ষা বাড়ায় এবং কত দিন সেই সুরক্ষা থাকে—এসব বিষয়ে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
প্রসূতি ও স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞদের সংগঠন অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি রওশন আরা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছয় মাস বয়সী শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে—এটি আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। এ অবস্থায় মা হওয়ার পরিকল্পনায় থাকা নারীদের টিকাদান একটি কার্যকর প্রতিরোধ কৌশল হতে পারে। তবে এ নিয়ে আগাম একটা অন্তত গবেষণা হওয়া দরকার। আর টিকাবিশেষজ্ঞরা যদি একমত হন, তবে আমার মনে হয় টিকা দেওয়া যায়।’
একটি গবেষণা হতে পারে বলে মনে করেন অধ্যাপক নজরুল ইসলামও। এ ক্ষেত্রে তাঁর পরামর্শ, যেসব শিশু এবার হামে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের মায়েদের অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা যেতে পারে। প্রতি বিভাগে ৫০ জন করে ৪০০ মায়ের অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করলেই হামের টিকার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
রুবেলার টিকাও ‘জরুরি’
হামের সঙ্গে আরেকটি রোগের কথা আসে। সেটি হলো রুবেলা, যাকে বড় হাম নামে ডাকা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় একজন নারী যদি রুবেলায় আক্রান্ত হন, তবে তা গর্ভের শিশুর নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এর মধ্যে আছে শ্রবণশক্তি হারানো, হার্টের সমস্যা, চোখের সমস্যা। এটাকে বলে ‘কনজেনিটাল রুবেলা সিনড্রোম।’ গর্ভধারণে ইচ্ছুক নারীদের এ টিকা দেওয়ার পরামর্শ আছে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের।
ওজিএসবির সাবেক সভাপতি, স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ ডা. ফেরদৌসী বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক নারীই জানেন না যে গর্ভধারণের আগে কিছু টিকা নেও��া প্রয়োজন হতে পারে। আমাদের দেশে এখনো প্রি-কনসেপশন কাউন্সেলিং খুব প্রচলিত নয়। কিন্তু সন্তান নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া গেলে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য দুটিই সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। এর মধ্যে বিশেষ করে রুবেলার টিকা উল্লেখযোগ্য। এটা ভয়ানক অসুখ। রুবেলার টিকা নেওয়া দরকার সন্তান নিতে ইচ্ছুক নারীদের।’
টিকা নেওয়া হয়নি, এমন কিশোরী বা কিশোরদেরও হামের টিকা দেওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন ফেরদৌসী বেগম। তিনি আরও যোগ করেন, টিকা নেওয়ার পর অন্তত এক মাস গর্ভধারণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে কোনো ঝুঁকি না থাকে।
সরকার কী ভাবছে
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় এখন বিশেষ কর্মসূচি চালু করে সন্তান নিতে ইচ্ছুক নারীদের টিকা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।
এখন ইপিআই কর্মসূচি দেখভাল করছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. হাসানুল মাহমুদ । তিনি বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন আমরা হামের যে টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছি, তা জাতীয় টিকাদান–সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপের (নাইট্যাগ) পরামর্শক্রমে। তাঁরা যদি এ ধরনের কোনো পরামর্শ দেন, তবে আমরা এই কর্মসূচি শুরু করতে পারি।’
Published: আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৩: ৫২
Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/7io4mohvvj
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!