হাম ঠেকানোর সব কিছুতেই ‘ঘাটতি’

আব্দুস সবুর লোটাস, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম আব্দুস সবুর লোটাস, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published on
1 views
1 impressions

“জরুরি অবস্থা ঘোষণার দরকার ছিল, সেটা হয়নি; সচেতনতা বাড়ানোর ক্যাম্পেইনও হয়নি। বলা যায়, হাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল,” বলেন এক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

টিকা, সিরিঞ্জ, কিট, পরীক্ষাগার, জনসচেতনতা কিংবা সরকারের আন্তরিকতা–হামের প্রকোপ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় সব কিছুতেই ঘাটতি দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এসব ঘাটতির কারণেই দেশে হামের প্রকোপ মহামারী পর্যায়ে চলে গেছে। সরকার এসব ঘাটতির কথা স্বীকার করছে ঠিকই; কিন্তু এর দায় তারা চাপাচ্ছে আগের দুই সরকারের ঘাড়ে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে মঙ্গল সকাল পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের লক্ষণ নিয়ে অন্তত ২২৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। কিন্তু দেশে হামের নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে কেবল মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাবে। এর বাইরে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর’বি) ও চট্টগ্রামে একটি ল্যাব থাকলেও নানা জটিলতায় সেগুলোতে হামের নমুনা পরীক্ষা বন্ধ আছে। নমুনা পরীক্ষার সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের একজন চিকিৎসক বলেন, “আসলে দেশের সব নমুনা এক জায়গায় আসে। সেখানে দিনে ১২০টির বেশি নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা নেই।” নাম প্রকাশ না করে এই চিকিৎসক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নানা ক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতা বেড়েছে। ফলে দেশে ল্যাব বসানোসহ অন্যান্য অবকাঠামো বাড়ানো দরকার। কিন্তু সেটি না করে চিকিৎসা খাত কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছে।” জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা বলেন, হামের নমুনা পরীক্ষার সব কিট সরবরাহ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। একটি কিটে ৯০টি নমুনা পরীক্ষা করা যায়। রোববার পর্যন্ত তাদের ল্যাবে মাত্র তিনটি কিট ছিল। তবে ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোমিনুর রহমানের ভাষ্য, তারা গত ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কাছে ৬০টি কিট চেয়েছিলেন। সেগুলোর চালান রোববার দেশে পৌঁছেছে। আগামী সপ্তাহে আরও ১০০টি কিট আসবে বলেও তথ্য দেন তিনি। এবার হঠাৎ রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি কিটের প্রয়োজন পড়ার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, “আসলে আগের বছরগুলোতে যে হারে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে, তাতে সর্বোচ্চ ২০টা কিট লাগত। “সে হিসাবেই আমাদের কাছে কিট ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি ধারণা করে আমরা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে ৬০টি কিট চেয়েছিলাম।” হাম ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ হিসেবে অনেকে টিকাদানের ঘাটতির কথা সামনে আনছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন মনে করেন, “হাম ছড়িয়ে পড়ার পেছনে প্রধান কারণ হতে পারে টিকাদানের ঘাটতি। “যেসব শিশুর টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তাদের অনেকে হয়ত তা পায়নি। ফলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।” হামের প্রকোপের পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা থাকার কথাও বলেন তিনি। সঙ্গে সমালোচনা করেন মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের। গত শনিবার ঢাকায় হাম নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ডাকা সংবাদ সম্মেলনে মুশতাক হোসেন বলেন, “হামের মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল, যদি সময়মত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যেত। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা কেনা নিয়ে গাফিলতি, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং জনস্বাস্থ্যের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা হামের এই 'মহামারী' ডেকে এনেছে।" হামের যে পরিস্থিতি, তাতে জনস্বাস্থ্যের ব্যাপারে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা উচিত ছিল বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, জরুরি অবস্থার পাশাপাশি ‘স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি’ চালু করতে হবে। “এতে যার যা কাজ, সেটি করার ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কারো অনুমতি বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকে না; সবাই নিজেদের মতো কাজ করতে পারে। এতে সমস্যা সমাধান সহজ হয় এবং পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবেলা করা যায়,” যোগ করেন তিনি। আরেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এ কে আজাদ খানও টিকাদান কর্মসূচিতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন। তিনি বলেন, “টিকার জন্য আমাদের মত বৃহৎ জনগোষ্ঠীর একটা দেশের বাইরের ওপর নির্ভরশীল হলে চলবে না। নিজেদের দেশে টিকা উৎপাদনের ব্যাপারে কাজ করতে হবে।” হামের প্রকোপ মোকাবেলায় সোমবার থেকে সারাদেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তিন সপ্তাহের এ কর্মসূচিতে এক কোটি ৭০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। কিন্তু সরকারের হাতে টিকা থাকলেও পর্যাপ্ত সিরিঞ্জ নেই। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কর্মকর্তারা বলেন, দুই কোটি হামের টিকা দেওয়ার জন্য তাদের হাতে ‘মিক্সিং সিরিঞ্জ’ রয়েছে ৪৫ হাজারের মত। বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারা বলেন, হাম-রুবেলার টিকা দেওয়ার জন্য দুই ধরনের সিরিঞ্জ প্রয়োজন পড়ে। ৫ মিলির সিরিঞ্জ দিয়ে টিকা মেশানো বা ‘মিক্সিং’ করা হয়। আর শূন্য দশমিক ৫ মিলির সিরিঞ্জ দিয়ে টিকা দেওয়া হয়। টিকার একটি ‘ভায়ালে’ ১০ ডোজ টিকা থাকে। আর একটি ‘ভায়াল’ সংমিশ্রণের জন্য প্রয়োজন পড়ে একটি ৫ মিলির সিরিঞ্জ। সে হিসাবে ২ কোটি ডোজ টিকা মিক্সিংয়ে প্রয়োজন্য দরকার ২০ লাখ সিরিঞ্জ। নাম প্রকাশ না করে ইপিআইয়ের সদ্য সাবেক একজন উপ-পরিচালক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখন টিকা আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত সিরিঞ্জ নাই। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তিন চালানে কয়েক লাখ সিরিঞ্জ আসার কথা রয়েছে।” ইপিআইয়ের সহকারী পরিচালক হাসানুল মাহমুদ বলেন, “আমাদের কাছে যে পরিমাণ ‘মিক্সিং’ সিরিঞ্জ আছে, তা দিয়ে ক্যাম্পেইন চালানো সম্ভব এবং টিকাদান কর্মসূচি চলছে। এছাড়া দ্রুত সিরিঞ্জ নিয়ে আসার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।” গেল ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পরের মাসে দেশে হামের প্রকোপ দেখা দেয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ও লক্ষণ নিয়ে অনেক মৃত্যুর খবর আসতে থাকে। সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, এ পরিস্থিতির জন্য আগের দুই সরকার দায়ী। এজন্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ও সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের অভিযোগ, গত আট বছরে দেশে হামের কোনো টিকাই দেওয়া হয়নি। প্রধামন্ত্রীর ভাষায়, শিশুদের হামের টিকার ব্যবস্থা না করে বিগত দুই সরকার ‘ক্ষমাহীন অপরাধ’ করেছে। আগের দুই সরকারের দায় থাকলেও বর্তমান সরকারের মধ্যেও ‘আন্তরিকতার’ ঘাটতি দেখছেন কেউ কেউ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, “হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পর একটা জরুরি অবস্থা ঘোষণার দরকার ছিল; সেটা করা হয়নি। “সাধারণ মানুষদের সচেতন করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ক্যাম্পেইন করার দরকার ছিল, সেগুলো কিছু হয়নি। সেদিক থেকে বলা যায়, সরকারের হাম নিয়ন্ত্রণে আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল।” দেশের স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়নের একটি বড় কর্মসূচি–এইচপিএনএসপি। এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হত ‘অপারেশন প্ল্যান’ বা ‘ওপির’ মাধ্যমে। ইপিআই কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘ওপি’ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় এক ধরনের ধস নামে। দেশের টিকা কার্যক্রমে ভাটা পড়ে, জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ঘাটতি, মাঠপর্যায়ে কর্মীদের বেতন বন্ধ— সব মিলিয়ে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ে যায়। আরো পড়ুন শয্যা খালি নেই, করিডোরেও চলছে চিকিৎসা: হামের বিস্তার বাড়ল কেন? গত ৮ বছর দেশে হামের টিকাই দেওয়া হয়নি: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিগত সরকারের গাফিলতিতে সময়মতো হামের টিকা আসেনি: প্রতিমন্ত্রী টুকু হামের টিকার ব্যবস্থা না করার ব্যর্থতা গত দুই সরকারের ক্ষমাহীন অপরাধ

Published: 22 Apr 2026, 01:37 AM

Source: https://bangla.bdnews24.com/health/7db0820ae071

Rate This Content

0.0/5 | 0 ratings
Not rated yet
5
0
4
0
3
0
2
0
1
0

Comments Section

Comments

0 Comments

Processing your comment...

Share Your Thoughts
Replying to
Preview
0 /2000
Pick an emoji
😀 😃 😄 😁 😅 😂 🤣 😊 😇 🙂 😉 😌 😍 🥰 😘 😗 😙 😚 🤗 🤩 🤔 🤨 😐 😑 😶 🙄 😏 😣 😥 😮 🤐 😯 😪 😫 😴 😌 😛 😜 😝 🤤 😒 😓 😔 😕 🙃 🤑 😲 ☹️ 🙁 😖 😞 😟 😤 😢 😭 😦 😧 😨 😩 🤯 😬 😰 😱 🥵 🥶 😳 🤪 😵 🥴 😠 😡 🤬 👍 👎 👌 ✌️ 🤞 🤟 🤘 🤙 👈 👉 👆 👇 ☝️ 🤚 🖐 🖖 👋 🤙 💪 🙏 ✍️ 💅 🤳 💃 🕺 👯 🧘 🏃 🚶 🧍 🧎 💻 📱 ⌨️ 🖱 🖥 💾 💿 📀 🎮 🎯 🎲 🎰 🎳 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 🎷 🎺 🎸 🎻 🎭 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 💕 ❤️ 💔 💖 💗 💓 💞 💝 💘 ❣️ 💟 🔥 💫 🌟 💥 💯 🎉 🎊 🎈 🎁 🏆 🥇 🥈 🥉 🏅 🎖
No comments yet

Be the first to share your thoughts!