
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চর্চিত অনেকগুলো শব্দের মধ্যে একটি ছিল ‘গুপ্ত’। এই ‘গুপ্ত’ বলাবলিকে কেন্দ্র করে সংহিসতার ঘটনাও ঘটেছে। কেউ কেউ ‘গুপ্ত’ বলাকে ‘গালাগালি’ হিসেবে দেখছে।
প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক মাঠে ‘গুপ্ত’ কেন এল? আর গুপ্ত কেউ থাকলে সমস্যাই–বা কী? এ বিষয়ে আলোচনার আগে ১৯৫৪ সালে মার্কিন জেনারেল জিমি ডলিটল সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারকে ‘গুপ্ত রাজনীতির’ বিষয়ে যে প্রতিবেদন লিখেছিলেন, তার কিছু অংশ পড়ে আসা যাক। জিমি ডলিটল লিখেছিলেন, আমরা এমন এক আপসহীন শত্রুর মুখোমুখি, যার লক্ষ্য হলো যেকোনো উপায়ে এবং যেকোনো মূল্যে বিশ্বে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। এ ধরনের খেলায় কোনো নিয়ম নেই। এখানে প্রচলিত মানবিক আচরণের যে গ্রহণযোগ্য নীতিমালা ছিল, তা খাটে না।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বদরবারে টিকে থাকতে চায়, তবে দীর্ঘদিনের ‘ন্যায্যতার খেলা’ ধারণাগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে। আমাদের কার্যকর গোয়েন্দাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাদের আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে আরও বুদ্ধিদীপ্ত ও পরিশীলিত উপায়ে তাদের দুর্বল, ধ্বংস ও বিপর্যস্ত করার যাবতীয় কৌশল শিখতে হবে।
মার্কিন জেনারেল কমিউনিস্টদের ��াত থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য ‘বিদেশে গুপ্ত রাজনীতির’ কলাকৌশল সম্পর্কে সে দেশের নীতিনির্ধারকদের সতর্ক করলেও আমাদের দেশের ঘটনা ঘটছে নিজেদেরই মধ্যে। বিরোধীদের দুর্বল ও ধ্বংস করার কৌশল হিসেবে গুপ্ত রাজনীতির পথ বেছে নেওয়ার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত আমাদের সুষ্ঠু ধারার রাজনীতির বড় বাধা তৈরি করছে।
চব্বিশের আন্দোলনকালে ধর্মভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দলের ‘বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক’ ছাত্রসংগঠনের যে কমিটির নেতাদের নাম এসেছে, তাঁদের সেই পদ–পদবির বিষয়ে তাঁদের শ্রেণিবন্ধুরা অবগত ছিলেন না। এ কারণে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা ছাত্রলীগের ভেতর থেকে অনেকেই ‘মুখোশ’–এর আড়ালে রাজনীতির চর্চায় ব্যস্ত ছিলেন বলে বিভিন্নজন অভিযোগ তুলেছেন। এখন অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তাহলে ছাত্রলীগ অতীতে ‘হেলমেট’ নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পিটিয়েছে, তাতে কি গুপ্ত রাজনীতিরও প্রভাব ছিল?
গুপ্ত রাজনীতিতে জড়িত থাকার বড় সুবিধা হলো, প্রতিপক্ষ দলের নেতা হওয়ার পর তাদের নানা কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে আগেভাগেই দলকে অবহিত করা যায়, তেমনি প্রতিপক্ষ দলকে ঘায়েল করতে ‘নানা ধরনের বিতর্কিত’ কর্মকাণ্ড করার সুযোগ থাকে, যার দায় গিয়ে মূল দলের ওপর পড়লেও পক্ষান্তরে নিজের আদর্শিক দল শক্তিশালী হয়।
অন্যদিকে যেসব দলের ভেতর ‘অনুপ্রবেশকারীরা’ স্থান পায়, তারা সেসব দলকে নৈতিক ও আদর্শিকভাবে দুর্বল করে তোলে। মুখে এক আর অন্তরে আরেক বিশ্বাস থাকা ব্যক্তিদের ‘ধর্মীয়ভাবে’ তিরস্কার করা হলেও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাই যদি এই কভারড পলিটিকসের আশ্রয় নেন, তাহলে সেটি কেবল ভয়ানকই নয়, বরং রাজনীতির প্রতি আস্থা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে। গুপ্ত রাজনীতির ভয়াবহতা হলো, এটি ধীরে ধীরে দৃশ্যমান রাজনীতিকে গ্রাস করে ফেলে।
প্রশ্ন হলো, কেন গুপ্ত রাজনীতির চর্চার প্রয়োজন পড়ল? কেন কেবল একটি বিশেষ দলের নেতাদেরই গুপ্ত রাজনীতির খপ্পরে থাকতে হলো?
এ প্রশ্নের উত্তর সহজে দেওয়া যায়, তা হলো ‘গণতান্ত্রিক’ রাজনীতির চর্চার সুযোগ না পাওয়া। ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রকাশ্যে রাজনীতি ‘নিষিদ্ধ’ই ছিল। ফলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এই রাজনৈতিক ঘরানার শিক্ষার্থীরা ভর্তি হলেও প্রকাশ্যে ছাত্ররাজনীতি সুযোগ ‘না’ থাকায় তাঁদের অপ্রকাশ্যেই রাজনীতি করতে হয়েছে বছরের পর বছর। যদিও অপ্রকাশ্যে অনেক সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় থাকতে পারে, তবে এক দলের অনুসারী হয়ে অন্য দলের ভেতর ‘ছদ্মবেশে’ থাকার কৌশল রপ্ত করায় এই সংগঠনের চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর পূর্ণশক্তিতে আবির্ভাব হওয়ার সুযোগ মিলেছে। অন্য রাজনৈতিক দলের ‘মূলনীতি’ রপ্ত করা কঠিন না হওয়ার সুবিধাও তারা নিয়েছে।
এ–ই যখন পরিস্থিতি, তখন স্বাভাবিকভাবে গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলো গুপ্ত রাজনীতির এই দৃশ্যায়ন দেখে কিছুটা ভীত হবে—এটাই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করে আরেক রাজনৈতিক দলে প্রবেশের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও ‘অপ্রকাশ্যে’ বিপরীত রাজনীতির আদর্শকে লালনকারীরা যখন ঢুকে পড়ে, তখন উদারপন্থী রাজনৈতিক দলগুলা বিপদে পড়তে বাধ্য।
গুপ্ত রাজনীতি নিঃসন্দেহে একটি ‘ভয়ের রাজনীতি’ সংস্কৃতি তৈরি করে। আস্থার সংকট তৈরি করে দলীয় কোন্দল যেমন বাড়াতে পারে, তেমনি পেছন দিক থেকে ছুরি মেরে সামনে গিয়ে দুঃখবোধের মেকি আবেগ পুরো ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে’ ধ্বংস করতে বাধ্য। গুপ্ত রাজনীতির ফলে তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি রাজনীতির একটি অস্ত্র হিসেবে তারা ব্যবহার করতে পারে।
শুধু ছাত্রসংগঠন নয়, যেকোনো রাজনৈতিক দল যখন দীর্ঘদিন ধরে গুপ্ত রাজনীতির মধ্যে বাস করে, তখন সন্দেহ একটি স্বাভাবিক মানসিকতায় পরিণত হয়। মানুষ বিশ্বাস করতে পারে না, কে তার বন্ধু আর কে তার শত্রু। এই অবিশ্বাস গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি। কারণ, গণতন্ত্র মূলত পারস্পরিক আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
এখন প্রশ্ন হলো, গুপ্ত রাজনীতি ঠেকানো যাবে কীভাবে?
গুপ্ত রাজনীতি বন্ধ করতে হলে সবার আগে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে আসা জরুরি। রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোকে সমমর্যাদায় গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চার সুযোগ দিতে হবে। কোনোভাবে একটি গণতান্ত্রিক সংগঠনকে ‘ক্ষমতা’ কিংবা প্রলোভন দেখিয়ে ঠেকিয়ে কিংবা নিজেদের দিকে না নেওয়া; বরং আদর্শিক রাজনৈতিক চর্চার অবারিত সুযোগ তৈরি করা দায়িত্ব।
নৈতিকভাবে শক্তিশালী নেতা তৈরি না হলে একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের ভিত শক্তিশালী হতে পারে না। তাই পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার দ্বার উন্মুক্ত করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলো যে নেতৃত্ব তৈরি করে, সেই নেতৃত্ব অবশ্যই সৎ হওয়া বাঞ্ছনীয়। আদর্শিক রাজনীতির মাঠ উন্মুক্ত না হলে গোপন বা অনুপ্রেবেশের রাজনীতি বন্ধ হবে না।
গুপ্ত রাজনীতি কোনো গুণ নয়, বরং এটি পরিশীলত রাজনীতিচর্চার বড় অন্তরায়। যাঁরা মনে করেন, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য গুপ্ত রাজনীতি জিইয়ে রাখবেন, তাঁরা কখনোই কোনো জাতির মূল্যবান সম্পদ নন।
রাজনীতিবিদেরা যত দিন সততার রাজনীতি করতে শিখবেন না, তত দিন এ দেশ নৈতিকভাবে দুর্বল থাকবে, দুর্নীতি ও অনিয়মের আখড়া থেকে মুক্ত হতে পারবে না। তাই সব রাজনৈতিক দলের উচিত গুপ্ত রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এটি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধ নয়, বরং যারাই গুপ্ত রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়বে, তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বর্জন করা। সুস্থ ধারার রাজনৈতিক চর্চা ফেরাতে হলে সরকারকে অবশ্যই সব গণতান্ত্রিক দলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে কেউ গুপ্ত থাকার পক্ষে সাফাই গাইতে না পারে।
ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: [email protected]
* মতামত লেখকের নিজস্ব
Published: প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৫: ৪৩
Source: https://www.prothomalo.com/opinion/column/70q4stndxh
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!