
বৃষ্টির কারণে কিশোরগঞ্জের কৃষকেরা ধান কাটতে ও শুকাতে সমস্যায় পড়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগ ধান গজিয়েছে বা পচে গেছে।
‘গিরস্তি আর করতাম না, সব ধান গেজায়া গেছে। খেত বেচ্ছে লগ্নি (ঋণ) দিতে অইব।’
চারা গজিয়ে যাওয়া ধান হাতে আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন কিশোরগঞ্জের নিকলীর শাহপুর এলাকার কৃষক রেদোয়ান মিয়া। বৃষ্টির কারণে প্রায় ১০ দিন আগে তিনি ধান কেটে স্তূপ করে রেখেছিলেন। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে রোদ ওঠায় স্ত্রী উজালা খাতুনকে নিয়ে সেসব ধান শুকাতে গিয়ে দেখেন, ধানের চারা (অঙ্কুর) গজিয়েছে। অনেক ধান পচে গেছে। তিনি জানান, পাশের বুরুলিয়া হাওরে এবার তিন একর জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। দুই একর ধানখেত পানিতে তলিয়ে গেছে। আর এক একর জমির ধান কেটেছিলেন।
নিকলীর দক্ষিণ জাল্লাবাদ এলাকার কৃষক আবদুল কাদির বলেন, ‘এই যে ধান সব ফানির নিচে ডুব্বে গেছে, এহন লগ্নি কেমনে দেম? নিজেরা খায়াম কী আর ফোলাফাইনতেরে (ছেলেমেয়েদের) লেহাফড়া কেমনে করাইয়াম?’
কিশোরগঞ্জে আজ সকাল থেকেই রোদ। জেলার নিকলীর সদর শাহপুর, নোয়াপাড়া, সিংপুরসহ পাশের করিমগঞ্জ ও কটিয়াদী উপজেলার কিছু অংশ ঘুরে দেখা গেছে, সারা দিন কিষাণ–কিষানিরা জমিতে, খলায় ও সড়কের ওপর কিছুটা স্বস্তিতে ধান মাড়াই ও শুকানোর কাজ নিয়ে ব্যস্ত। তবে ধানের পচা গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বেশির ভাগ ধানের চারা গজিয়ে গেছে। সেসব ধানও কৃষকেরা হাঁসের খাবারের জন্য শুকাতে দিচ্ছেন। তা ছাড়া সকাল থেকে আকাশ পরিষ্কার হয়ে রোদ ওঠায় হাওরজুড়ে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। কৃষকের ডুবে যাওয়া খেত ও খলায় স্তূপ করে রাখা ধান শুকানোর পাশাপাশি মাড়াই করছেন। কেউ আবার ভেজা খড় শুকিয়ে গাদা তৈরি করছেন। সারাদিন কর্মব্যস্ততা কৃষকদের।
নিকলী সদরের কৃষক হারুন অর রশিদ বলেন, আজ যেভাবে রোদ উঠেছে, রোদ যদি আরও এক সপ্তাহ থাকে আর যদি বৃষ্টি না হয়, তাহলে কিছুটা হলেও কৃষকেরা রক্ষা পাবেন।
সমেদ আলী নামে করিমগঞ্জের সুতারপাড়া এলাকার আরেক কৃষক বলেন, হাওরে রোদ ফিরলেও নদনদীর পানি বৃদ্ধিতে তাঁদের দুশ্চিন্তা এখনো কাটেনি। বেশির ভাগ কৃষকের কাটা ধান পচে নষ্ট হয়ে গেছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যে অন্তত খলার ধানগুলো শুকানো সম্ভাব হবে।
কামরুল হাসান নামে নিকলী সদরের আরেক কৃষক জানান, বুরুলিয়া হাওরে তিনি আট একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। বেশির ভাগ জমি তলিয়ে গেছে। অল্প জমি নিমজ্জিত না হলেও সেগুলো থেকে ধান কাটাতে এখন দুই হাজার টাকা করেও শ্রমিক পাচ্ছেন না। আর পানি বেশি হওয়ায় এসব জমিতে হারভেস্টার মেশিনও নেওয়া যাচ্ছে না। এতে তাঁর ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে।
নিকলী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আজ রাতেও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, দুটি নদীতে চার সেন্টিমিটার ও একটি নদীর এক সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান জানান, আজকের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে অষ্টগ্রামে আরও ৬০৫ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। এতে আনুমানিক ১ হাজার ৮০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত জেলায় ১৩ হাজার ১২৭ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে এবং প্রায় ৫১ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরিতে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে।
Published: প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ১৪: ১৮
Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/l6bty9ntxk
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!