
আগামী ৫ বছর পশ্চিমবঙ্গ শাসন করার স্বপ্ন এখন মমতার কাছে দুঃস্বপ্ন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো এমনটা ভাবেননি। এভাবে গেরুয়া–ঝড়ে তছনছ হয়ে যাবে তাঁর সাজানো বাগান। মাত্র ১৫ বছরেই ভেঙে চুরমার হলো তৃণমূলের স্বপ্ন। আগামী ৫ বছর শাসন করার স্বপ্ন এখন মমতার কাছে দুঃস্বপ্ন। বাংলায় এবার ‘পদ্মাসনে’ বসতে চলেছে বিজেপি। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ—সর্বত্রই তৃণমূলের বাগান তছনছ হয়েছে। এমনকি খাস কলকাতাতেও ঘটেছে শাসকদলের মহাপতন। অথচ ফল প্রকাশের আগের দিনও মমতা জোর দিয়ে বলেছিলেন, তৃণমূলই ক্ষমতায় থাকছে এবং মানুষ বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু সোমবার ভোট গণনা শুরু হতেই চিত্রটা পাল্টে যায়। চারদিকে জোড়া ফুল ঝরতে শুরু করে আর ফুটতে থাকে পদ্ম। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪ আসনের মধ্যে ২০৬টিতে জয়ী হয়েছে বিজেপি। বিপরীতে তৃণমূল জয় পেয়েছে ৮০টি আসনে, আর একটি আসনে তারা এগিয়ে আছে। এ ছাড়া বাম-আইএসএফ জোট এবং কংগ্রেস পেয়েছে ২টি করে আসন। বিজেপির জয়ের খবর ছড়াতেই রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে গেরুয়া–ঝড়। গেরুয়া আবির আর লাড্ডু-মিষ্টি নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন বিজেপি সমর্থকেরা। অন্যদিকে স্তব্ধ হয়ে গেছে তৃণমূলের সব আস্ফালন। এদিকে বিজেপির ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত হতেই নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে প্রশাসনিক স্তরে। সচিবালয় নবান্নসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কোনো নথি যাতে গায়েব বা পাচার হতে না পারে, সে জন্য নবান্নে ঢুকে পড়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। শুরু হয়েছে কড়া তদারকি। নবান্নের প্রতিটি ফটকে এখন কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া পাহারা। সরকারি সূত্র বলছে, নবান্নে প্রবেশ বা বের হওয়ার সময় প্রত্যেক ব্যক্তিকে তল্লাশি করা হচ্ছে। শুধু নবান্ন নয়, রাজ্যের সব সরকারি দপ্তরেই এখন কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নজরদারি চলছে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র যাতে কোনোভাবেই বাইরে নেওয়া না যায়, তা নিশ্চিত করতেই এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এই রাজ্যের মানুষ মমতার পরাজয়ের নেপথ্যের নানা কারণ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। সাধারণ মানুষের মতে, তাঁর শাসনামলে রাজ্যে কোনো নতুন শিল্পায়ন হয়নি; বরং বহু কলকারখানা বন্ধ হয়েছে এবং মালিকেরা অন্য রাজ্যে চলে গেছেন। সিঙ্গুরে টাটা কোম্পানির ন্যানো গাড়ির কারখানার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে মমতা শুধু সেই প্রকল্পই বন্ধ করেননি বরং গোটা রাজ্যের শিল্পায়নের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন। নিবিড় সংশোধিত ভোটার তালিকা (এসআইআর) প্রণয়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মানুষকে ভুল বোঝানো এবং বিজেপি এলে বাঙালির প্রিয় মাছ-ভাত-মাংস খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে—এমন সব অলীক অভিযোগ তুলে মমতা কার্যত ব্যাকফুটে চলে গেছেন। এ ছাড়া ভিন রাজ্যের বাঙালিরা বাংলায় কথা বললে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে, এমন অভিযোগও সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। পাশাপাশি রাজ্যজুড়ে তৃণমূল নেতা–কর্মীদের ভূমি দখল, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির পাশাপাশি হিন্দুত্ববিরোধী বক্তব্যও রাজ্যবাসী মেনে নিতে পারেনি। বিশেষ করে তরুণসমাজকে চাকরির সুযোগ না দিয়ে কেবল ‘ভাতা’র রাজনীতিতে আবদ্ধ রাখার কৌশলও বুমেরাং হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রবল মমতা-বিরোধী ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে তাঁর সাজানো বাগান; গেরুয়া–ঝড়ে উড়ে গেছে মমতার সব স্বপ্ন। এদিকে বিজেপির এই বিপুল জয় নিশ্চিত হতেই রাজ্যজুড়ে গেরুয়া আবিরের উৎসবে মেতেছেন কর্মী-সমর্থকেরা। নির্বাচনী প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাঙালির প্রিয় মাছ-ভাত-মাংস খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। সেই ‘ভুয়া’ প্রচারের প্রতিবাদ জানাতে সোমবার কলকাতা ও বিভিন্ন জেলার বিজেপি কার্যালয়গুলোতে ঘটা করে ভাত-মাছ, মাংস ও ডিমের ভোজের আয়োজন করা হয়। কোনো কোনো দপ্তরে আবার বিরিয়ানি খাওয়ারও ব্যবস্থা করা হয়। এর পাশাপাশি বিভিন্ন দপ্তরে আয়োজন করা হয় ঝালমুড়ি খাওয়ার। ঝাড়গ্রামে ফুটপাতের দোকান থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঝালমুড়ি খাওয়া নিয়ে বিদ্রূপ করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই ঘটনার প্রতিবাদেই এদিন এই প্রতীকী আয়োজন করা হয়। বিজেপির কর্মীরা কটাক্ষ করে বলছেন, এবার তৃণমূলের মুখে ঝালমুড়ির ঝাল পড়বে। তাঁদের মতে, এসব জনবিচ্ছিন্ন আচরণের কারণেই মমতার এমন চরম বিপর্যয় হয়েছে। নির্বাচনের এই ফল ঘোষণার পর বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে রাজ্যবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।Published: প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ১৯: ৫০
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!