
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানি এসকেএফ প্রথমবারের মতো দেশে আধুনিক ইনসুলিন কার্ট্রিজের উৎপাদন শুরু করেছে।
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানি এসকেএফ প্রথমবারের মতো দেশে নভো নরডিস্কের বিশ্বমানের আধুনিক ইনসুলিন কার্ট্রিজের উৎপাদন শুরু করেছে। ডেনমার্কের ওষুধ কোম্পানি নভো নরডিস্কের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে তারা এ উৎপাদন শুরু করেছে। ফলে ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য আধুনিক ইনসুলিন কার্ট্রিজ এখন থেকে সহজে ও তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাবে। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়। ‘সাবাশ বাংলাদেশ: ডেনমার্ক থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে আধুনিক ইনসুলিনের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। উচ্চমানের ডায়াবেটিসের চিকিৎসা সহজলভ্য করা ও বায়োলজিক ওষুধ উৎপাদনসক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ডেনমার্কের ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠান নভো নরডিস্ক ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে হিউম্যান ইনসুলিন উৎপাদন করছে। এমনকি বাংলাদেশে উৎপাদিত হিউম্যান ইনসুলিন রপ্তানিও করা হয়। তবে নভো নরডিস্কের ‘নভোমিক্স ও নভোর্যাপিড’সহ আধুনিক ইনসুলিন এত দিন ডেনমার্ক থেকে বাংলাদেশে আমদানি করা হতো। এসকেএফের সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে এখন থেকে নভো নরডিস্কের একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আধুনিক ইনসুলিন কার্ট্রিজ দেশেই উৎপাদন করা হবে, যা বাংলাদেশে প্রথম। ফলে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আধুনিক ইনসুলিন সহজে ও তুলনামূলক কম খরচে পাওয়া যাবে। আধুনিক ইনসুলিন হিউম্যান ইনসুলিনের তুলনায় আরও উন্নত। এটি শরীরে আরও কার্যকরভাবে কাজ করে। নভো নরডিস্কের বৈশ্বিক মান বজায় রাখতে বাংলাদেশে উৎপাদিত প্রতিটি ব্যাচের গুণগত মান ডেনমার্কে যাচাই করা হবে। এই উদ্যোগের জন্য নভো নরডিস্ক ও এসকেএফকে ধন্যবাদ জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘দেশে আধুনিক ইনসুলিন উৎপাদন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি ইনসুলিন উৎপাদনে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। তবে ওষুধের গুণগত মানে কোনো আপস করা যাবে না। দেশের জন্য এটি নতুন সূচনা। ডায়াবেটিস মোকাবিলায় বাংলাদেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবু জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তাই দেশেই তুলনামূলক কম দামে ইনসুলিন উৎপাদন অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। উৎপাদকদের কাছে অনুরোধ থাকবে, ওষুধের দাম যেন জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা হয়।’ আধুনিক ইনসুলিন কার্ট্রিজ সফলভাবে দেশে উৎপাদনের এই যাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ কে আজাদ খান। তিনি বলেন, এটি শেষ নয়; বরং একটি যাত্রার শুরু। আধুনিক ইনসুলিন বাংলাদেশে উৎপাদনের মাধ্যমে একটি নতুন পথচলার শুরু হলো। এই প্রযুক্তির ফলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে বায়োফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদনে আরও বড় সাফল্য অর্জন করবে। নভো নরডিস্ক এবং এসকেএফকে এই উদ্যোগের জন্য ধন্যবাদ জানান তিনি। নভো নরডিস্কের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জয় থ্যায়গারাজন বলেন, ‘এটি শুধু একটি প্রকল্প নয়, বাংলাদেশের লাখ লাখ ডায়াবেটিস রোগীর প্রতি দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার ও দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। আমরা এখন শুধু প্রযুক্তি স্থানান্তরের পর্যায়ে নেই, এমন একটি মাইলফলকে পৌঁছেছি, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে। প্রযুক্তি স্থানান্তরের অংশ হিসেবে আধুনিক ইনসুলিন উৎপাদনে সব কর্মীকে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এতে বাংলাদেশ এখন বায়োটেকনোলজির একটি সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।’ এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস ট্রান্সকম গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। অনুষ্ঠানে ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান বলেন, ‘আজকের দিনটি শুধু এসকেএফ নয়; বরং গোটা দেশের জন্য গর্বের। হিউম্যান ইনসুলিন উৎপাদনের পর থেকে ধাপে ধাপে আমরা সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছি। ডেনমার্ক থেকে প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে এখন দেশেই নভো নরডিস্কের আধুনিক ইনসুলিন তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করে প্রতিটি ইনসুলিন উৎপাদন করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিয়মিত বিশেষজ্ঞদের দিয়ে যাচাই করা হচ্ছে। এসকেএফ থেকে উৎপাদিত প্রতিটি ইনসুলিন নিরাপদ, কার্যকর ও সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন।’ এই উদ্যোগ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মুলার। তিনি বলেন, এই উদ্যোগে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সহজলভ্য হবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে স্থানীয় সক্ষমতা গড়ে তুলবে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. শামীম হায়দার বলেন, এ অর্জন দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রযাত্রা। এটি প্রমাণ করে যে উন্নত প্রযুক্তি ও উচ্চমানের উৎপাদনসক্ষমতা বাংলাদেশে স্থানান্তর সম্ভব হয়েছে। এ অর্জন দেশে উৎপাদিত ওষুধের গুণগত মান, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড পূরণের অঙ্গীকারকে শক্তিশালী করেছে। বারডেম একাডেমির পরিচালক ফারুক পাঠান বলেন, ‘বায়োলজিক ওষুধ উৎপাদনের একটি নতুন প্রযুক্তিতে প্রবেশ করছি আমরা। এই উৎপাদন খুবই কঠিন। উৎপাদনের ধাপে ধাপে মান বজায় রাখতে হয়। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের দেশের রোগীরা আধুনিক ইনসুলিন স্বল্পমূল্যে পাবে।’ নভো নরডিস্ক বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রিয়াদ মামুন প্রধানি অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন। এ ছাড়া নভো নরডিস্কের পরিচালক (জিসিএম) থমাস দিয়াগ, এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের নির্বাহী পরিচালক ইখতিয়ার হোসাইন, অধ্যাপক ডা. ফরিদ উদ্দিন ও জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন নভো নরডিস্ক বাংলাদেশের মার্কেটিং অ্যান্ড সিই বিভাগের প্রধান ডা. নুসরাত হাসান। অনুষ্ঠানে খুব শিগগির দেশে বড় ভ্যাকসিন উৎপাদন প্ল্যান্ট স্থাপনের কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দেশে একটি বড় ভ্যাকসিন উৎপাদন প্ল্যান্ট স্থাপন করতে যাচ্ছি, যা হামসহ অন্যান্য রোগের ভ্যাকসিন তৈরি করবে। এটি খুব শিগগির শুরু হবে। তবে এইচআইভি এইডস ও টিবির মতো সংক্রামক রোগ মোক��বিলায় আরও উদ্যোগ প্রয়োজন। আমরা চাই সরকারের পাশাপাশি ওষুধ প্রস্তুতকারকেরাও এগিয়ে আসুক।’Published: আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৬: ০৪
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!