
আজ রাতে পিএসজি বনাম বায়ার্নের ম্যাচেও তেমন একটি অলৌকিক মুহূর্তের দিকে তাকিয়ে থাকবে দল দুটির সমর্থকেরা। আজ রাতে সেই মুহূর্তের জন্ম দেবেন কে?
মুহূর্ত! হ্যাঁ, চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালের মতো বড় মঞ্চে পার্থক্য গড়ে দেয় মূলত একটি ‘মুহূর্ত’। এই ম্যাচকে সামনে রেখে কত বিশ্লেষণ আর কাটাছেঁড়া হয়। দুই দলের কৌশল, ভারসাম্য, ইতিহাস ও পরিসংখ্যান নিয়েও হয় বিস্তর আলোচনা। কিন্তু দিন শেষে ভাগ্যনির্ধারক হয়ে দাঁড়ায় সেই একটি মুহূর্তই। কোনো এক নায়কের হাত ধরেই সবুজ মাঠে তৈরি হয় সেই জাদুকরি মুহূর্তটি, যা ইতিহাসের পাতায় লিখে রাখে নতুন কোনো রোমাঞ্চকর গল্প। প্যারিসে আজ রাতে পিএসজি–বায়ার্ন মিউনিখের ম্যাচেও তেমন একটি অলৌকিক মুহূর্তের দিকে তাকিয়ে থাকবেন দল দুটির সমর্থকেরা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আজ রাতে সেই মুহূর্তটির জন্ম দেবেন কে? দুই দলেই আছে তারকা ফুটবলারের ছড়াছড়ি। নায়ক হওয়ার সামর্থ্যও আছে সবার। তবে সবচেয়ে বেশি যে দুটি নামের ওপর চোখ থাকবে, তাঁরা হলেন উসমান দেম্বেলে ও হ্যারি কেইন। সেমিফাইনালের বৈতরণি পেরিয়ে ফাইনালের মঞ্চে যেতে এ দুজনের ওপর নির্ভর করবে দল দুটি। দেম্বেলের হাত ধরেই গত মৌসুমে ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছিল পিএসজি। সর্বশেষ ব্যালন ডি’অরও জিতেছেন তিনি। অন্যদিকে কেইন এ মৌসুমে অবিশ্বাস্য ছন্দে আছেন। গোল করাকে ছেলেখেলা বানিয়ে ফেলেছেন। তবে এমন ম্যাচে পরিসংখ্যান বা সাম্প্রতিক ছন্দের পাশাপাশি আবির্ভূত হতে হয় মুহূর্তের নায়ক হিসেবেও। আজ রাতে সেই নায়ক হয়ে ওঠার সুযোগ আছে এ দুজনের। গত মৌসুমের তুলনায় চলতি মৌসুমটা দেম্বেলের জন্য বেশ কঠিন ছিল। চোটের কারণে তিনি পিএসজির হয়ে মিস করেছেন ১৯ ম্যাচ, যার প্রভাব মৌসুমের বিভিন্ন পর্যায়ে পিএসজি ঠিকই অনুভব করেছে। বিশেষ লিগ ‘আঁ’তে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণই ছিল দেম্বেলের অনুপস্থিতি। কিন্তু আশার বিষয় হচ্ছে প্রয়োজনীয় সময়ে ঠিকই পুরোনো রূপেই ফিরেছেন দেম্বেলে। লিভারপুলের বিপক্ষে দ্বিতীয় লেগে অ্যানফিল্ডে করা জোড়া গোল সেই প্রমাণই দেয়। আর এই দুই গোল বায়ার্নের জন্যও সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে আজকে রাতে। সেরা ছন্দের দেম্বেলে বিশ্বের যেকোনো পরাশক্তির জন্য মাথাব্যথার কারণ হতে পারেন। অন্যদিকে কেইনকে কেউ চাইলে এই মৌসুমে ধারাবাহিকতার প্রতীকও বলতে পারেন। তাঁর গোল করার দক্ষতা এককথায় অবিশ্বাস্য। এ মৌসুমে কেইনের শটকে গোলে রূপান্তর করার হার ৩১ শতাংশ। কেইন সাধারণত খুব একটা ড্রিবল করেন না, প্রতি ম্যাচে একটিরও কম। তাঁর চোখ থাকে মূলত বলকে জালে জড়ানোর দিকে। বক্সের ভেতর কেইনের পায়ে বল মানে গোলের নিশ্চিত সম্ভাবনা। চলতি মৌসুমে ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শুর দৌড়ে এগিয়ে থাকা কেইন ৪৫ ম্যাচে করেছেন ৫৩ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট। এককথায় অবিশ্বাস্য! তব এই মৌসুমে কেইনের পারফরম্যান্স শুধু একজন অভিজাত ফিনিশারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একই সঙ্গে একজন ডিপ-লাইং প্লেমেকারের ভূমিকাও পালন করছেন, যিনি দলের দ্রুতগতির উইঙ্গারদের জন্য জায়গা তৈরি করে দেন। কেইনের প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের (বিশেষ করে সেন্টারব্যাকদের) নিজ অবস্থান থেকে টেনে বের করে আনাতেও ভূমিকা রাখেন। এতে করে ডিফেন্সের পেছনে দৌড় দেওয়ার জন্য ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। ফুটবল পরিসংখ্যানভিত্তিক পোর্টাল ‘অপ্টা’র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কেইন যখন মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের মধ্যবর্তী জায়গায় বেশি সক্রিয় থাকেন, তখন তাঁর সতীর্থদের গোল করার সম্ভাবনা প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। অর্থাৎ, তিনি যদি হাফ স্পেসে ১৫টির বেশি বলে স্পর্শ পান, তাহলে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। কেইনের জবাব হিসেবে দেম্বেলেকে পিএসজির যোগ্যতম বলা যায়। তিনি এমন খেলোয়াড়, যিনি ম্যাচের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। দেম্বেলে বক্সের ভেতরে খুব বেশি বল স্পর্শ করেন না, কিন্তু প্রতিটি স্পর্শই বড় ধরনের হুমকি তৈরি করে। কেইনের বিপরীতে দেম্বেলের খেলা বেশি নির্ভর করে ব্যক্তিগত দক্ষতা ও তাৎক্ষণিক সি��্ধান্তের ওপর। এই মৌসুমে তাঁর ড্রিবলে সফলতার হার প্রায় ৬০ শতাংশ। এটুকুই বলে দিচ্ছে প্রতিপক্ষকে একে একে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি কতটা কার্যকর। তাঁর এই দক্ষতা গোলের সম্ভাবনা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিপক্ষের রক্ষণে আতঙ্কও তৈরি করে। দেম্বেলে সাধারণত পাসের অপেক্ষা করেন না, বল পেলে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যেই পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, চোটের কারণে ১৯টি ম্যাচ মিস করার পরও দেম্বেলে এখনো দলের সবচেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক হুমকি (এক্সপেক্টেড থ্রেট) তৈরি করা খেলোয়াড়। অর্থাৎ, বল নিয়ে এগোনোর সময় প্রতিপক্ষের জন্য সর্বোচ্চ বিপদ তৈরি করেন তিনিই। বিশ্লেষকদের মতে, যখন দেম্বেলেকে বল নেওয়ার জন্য নিচে নেমে আসতে হয়, তখন বক্সের ভেতরের কার্যকারিতা ব্যাপকভাবে কমে যায়। এ পরিস্থিতিতে বায়ার্নের মূল লক্ষ্য হবে কৌশলে দেম্বেলেকে ফাইনাল থার্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া এবং যতটা সম্ভব তাঁকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা। সব মিলিয়ে এই দুজনের পারফরম্যান্স ও কার্যকারিতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরো দলের আক্রমণভাগের ভারসাম্য ও প্রভাব। দেম্বেলে পিএসজিতে লুইস এনরিকের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্ট। ইনজুরিতে ভোগার পরও দলের আক্রমণে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা খেলোয়াড়দের একজন তিনি। আর এই মৌসুমে কেইনের শ্রেষ্ঠত্বের কথা তাঁর পারফরম্যান্সই বলছে। মাইকেল ওলিসে এবং লুইস দিয়াজকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন দুর্দান্ত এক ত্রয়ী। তবে এই ত্রয়ীর মধ্যমণি শেষ পর্যন্ত কেইনই। এর ফলে তাঁর জ্বলে ওঠা কিংবা না ওঠার ওপর নির্ভর করছে বায়ার্নের সাফল্যের অনেকটাই।Published: আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০: ২২
Source: https://www.prothomalo.com/sports/football/qaz6upgmqd
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!