‘বাতাসত গাছ হেলি পইজ্যে, পানিত ডুবি নষ্ট অর ধান’

আব্দুল কুদ্দুস আব্দুল কুদ্দুস
Published on
2 views
2 impressions

বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে ১৫-২০ দিন আগেই মাঠের ধান কেটে নিচ্ছেন কক্সবাজারের চাষিরা

কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নের বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা। পাকা সড়কের দুই পাশে কয়েক শ একরের বোরো ধানের খেত। কিছু ধান পেকে সোনালি রং ধরেছে, কিছু সবুজ (আধা পাকা) অবস্থায় রয়ে গেছে। এর মধ্যে কিছু ধানগাছ বাতাসে হেলে পড়েছে। কয়েকজন কৃষক হেলে পড়া গাছ কেটে নিচ্ছেন। আকাশে আজ মেঘ নেই। কিন্তু গত কয়েক দিনের বৃষ্টির পানি জমে আছে খেতে। বৃষ্টি আবারও হতে পারে এমন আশঙ্কায় ধান কাটছিলেন চাষিরা। কৃষকেরা জানালেন, মাঠের ধান ঘরে তুলতে আর মাত্র ১৫-২০ দিন বাকি। এই সময়টুকুতে ভারী বৃষ্টি হয়ে গেল। বৃষ্টির পানিতে আরও বেশি জলাবদ্ধতা দেখা দিলে মাঠের ধান পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে যাবে। তাই ঝুঁকি না নিয়ে ধান কাটছেন তাঁরা। আজ সোমবার দুপুরে খুরুশকুল এলাকায় গিয়ে এমন আগাম ধান কাটার আয়োজন দেখা গেল। আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ এম আবদুল হান্নান বলেন, গতকাল রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আকাশে গতকালও মেঘ ছিল। আজ মেঘ না থাকলেও যেকোনো সময় অঝোর ধারায় বৃষ্টি, বজ্রপাতসহ ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা আছে। ভারী বর্ষণ হলে কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস হতে পারে। খুরুশকুলের ফকির পাড়ার দুই একর জমিতে এবার বোরো ধানের চাষ করেন স্থানীয় কৃষক মোজাহের মিয়া। কয়েক দিনের বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় তাঁর প্রায় ৩০ শতক জমির ধানগাছ হেলে পড়েছে। শনিবার দুপুরে হেলে পড়া কিছু ধান কেটেছেন মোজাহের মিয়া। এখন খেতে জমে আছে হাঁটুসমান বৃষ্টির পানি। মোজাহের মিয়া (৫২) প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাতাসত গাছ হেলি পইজ্যে, পানিত ডুবি নষ্ট অই যারগই গাছর ধান। কিছু গরিবার নাই। আল্লাহ আল্লাহ গরির, আর কয়েক খান দিন বৃষ্টি ন দিবল্যাই। বন্যার মতো পানি জমিলে মাঠর ধান পচি শেষ অই যাইব।’(বাতাসে গাছ হেলে পড়েছে, পানিতে ডুবে নষ্ট হচ্ছে ধানগাছ। কিছু করার নাই। আল্লাহ আল্লাহ করছি, কয়েক দিন যেন বৃষ্টি না হয়। বন্যার মতো পানি জমলে খেতের ধান পচে শেষ হয়ে যাবে।) ফকিরপাড়ার পাশের নয়াপাড়া, তেতৈয়া, পালপাড়া, ফকিরপাড়ায়ও বেশ কিছু মাঠের ধানগাছ হেলে পড়তে দেখা গেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, এবার টেকনাফ, উখিয়া, রামু, ঈদগাঁও, চকরিয়া, পেকুয়া, কক্সবাজার সদর, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলাতে ৫৫ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হচ্ছে। হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয়—এই তিন জাতের ধানের বাম্পার ফলন হলেও শেষ মুহূর্তে ঝোড়ো হাওয়া ও ভারী বর্ষণের কবলে পড়ে কিছু চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশীষ কুমার প্রথম আলোকে বলেন, বন্যা ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে ধানের ক্ষতি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় জেলার বিভিন্ন উপজেলাতে আগাম ধান কাটা শুরু হয়েছে। বর্তমানে ৫১ শতাংশ মাঠের ধান কাটা হয়েছে। অবশিষ্ট ধানও আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে কাটা শেষ হয়ে যাবে। তবে কয়েক দফার বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় জেলায় ২০ একরের মতো ধান নষ্ট হয়েছে। ৩০ একরের বেশি গাছ হেলে পড়লেও ধানের তেমন ক্ষতি হয়নি। কিন্তু ভারী বর্ষণের ফলে বন্যা বা জলাবদ্ধতা দেখা দিলে মাঠের ধান নষ্ট হয়ে যেতে পারে। জেলায় কৃষকের সংখ্যা ২ লাখ ৩৭ হাজার। এর মধ্যে ১ লাখ ১৫ হাজার বোরো ধানের চাষ করছেন। গত বছর জেলার মাঠ থেকে চাল উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৫ মেট্রিক টন। চাষিরা জানান, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে মাঠের ধান নষ্ট হতে পারে। সে ক্ষেত্রে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হতে পারে। রামুর চাকমাকুলের মাদ্রাসাগেট এলাকায় ৯ কানি (৪০ শতকে এক কানি) জমিতে বোরো চাষ করেন স্থানীয় কৃষক ছাবের আহমদ। মাঠের ধান আধা পাকা থাকায় কাটতে পারছেন না জানিয়ে ছাবের আহমদ বলেন, গত কয়েক দিন থেমে থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে পাহাড়ি ঢলের তীব্রতা কম। পানি খালে নেমে যাওয়ায় খেতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে না। বাতাসে কিছু গাছ হেলে পড়লেও ধানের তেমন ক্ষতি হয়নি। কিন্তু আকাশের রোদ-বৃষ্টির খেলা মনে শঙ্কা জাগাচ্ছে। কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালীর কৃষক জয়নাল আবেদীন ও নবাব আলী বলেন, ধান ঘরে তুলতে আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তবে আকাশের কালো মেঘ, বিকট শব্দের বজ্রপাত আর থেমে থেমে বৃষ্টি হতে দেখলে বুক কেঁপে ওঠে। ভারী বৃষ্টির জলাবদ্ধতা এবং পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানি পাকা ধানের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। গত ২৬ এপ্রিলের কালবৈশাখীর ঝোড়ো হাওয়ায় টেকনাফ ও রামুতে কয়েক শ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেঙেছে শত শত গাছপালা। এ সময় ১০-১৫ একরের বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টেকনাফ সদর ইউনিয়নের খুনকারপাড়া, মহেশখালিয়াপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আগাম ধান কাটা শুরু হয়। এখন মাঠে ৪০ শতাংশ ধান অবশিষ্ট আছে জানিয়ে টেকনাফ সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার তাঁর ইউনিয়নে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ভারী বর্ষণ এবং জলাবদ্ধতা দেখা না দিলে পুরো মাঠের ধান ঘরে তুলতে পারবেন চাষিরা। তবে কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করে বলেন, বোরো ধানের চাষ করতে এবার কৃষকের শ্রমিকের বিপরীতে অতিরিক্ত টাকা খরচ হয়েছে। সেচ খরচ, জ্বালানিসংকট, অতিরিক্ত মূল্যে জ্বালানি সংগ্রহ, সার ও কীটনাশকের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ধান চাষের খরচও বেড়েছে অনেক। কিন্তু বাজারে ধানের তেমন দাম নেই। এর মধ্যে ঝড়বৃষ্টিতে যদি মাঠের ধান নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে লাখো কৃষককে পথে বসতে হবে। সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে কৃষকের তেমন ক্ষতি হয়নি জানিয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল কুমার প্��ামাণিক বলেন, যে বৃষ্টি হয়েছে তাতে ধানের তেমন ক্ষতি হয়নি। কারণ, বৃষ্টির আগের এক মাস তীব্র গরমে খেতের মাটি ফেটে গিয়েছিল, বৃষ্টি হওয়ায় ওই মাটি পানি শুষে নিয়েছে। তাতে কৃষকের লাভ হয়েছে, সেচ খরচ বেঁচে গেছে। তবে টানা কয়েক দিন ভারী বৃষ্টি হলে ফসলের ক্ষতি হতো। ভারী বর্ষণ হওয়ার আগে মাঠের ধান দ্রুত কেটে ফেলতে চাষিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।

Published: প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ০৭: ৪৩

Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/gxbfllaogp

Rate This Content

0.0/5 | 0 ratings
Not rated yet
5
0
4
0
3
0
2
0
1
0

Comments Section

Comments

0 Comments

Processing your comment...

Share Your Thoughts
Replying to
Preview
0 /2000
Pick an emoji
😀 😃 😄 😁 😅 😂 🤣 😊 😇 🙂 😉 😌 😍 🥰 😘 😗 😙 😚 🤗 🤩 🤔 🤨 😐 😑 😶 🙄 😏 😣 😥 😮 🤐 😯 😪 😫 😴 😌 😛 😜 😝 🤤 😒 😓 😔 😕 🙃 🤑 😲 ☹️ 🙁 😖 😞 😟 😤 😢 😭 😦 😧 😨 😩 🤯 😬 😰 😱 🥵 🥶 😳 🤪 😵 🥴 😠 😡 🤬 👍 👎 👌 ✌️ 🤞 🤟 🤘 🤙 👈 👉 👆 👇 ☝️ 🤚 🖐 🖖 👋 🤙 💪 🙏 ✍️ 💅 🤳 💃 🕺 👯 🧘 🏃 🚶 🧍 🧎 💻 📱 ⌨️ 🖱 🖥 💾 💿 📀 🎮 🎯 🎲 🎰 🎳 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 🎷 🎺 🎸 🎻 🎭 🎪 🎨 🎬 🎤 🎧 🎼 🎹 🥁 💕 ❤️ 💔 💖 💗 💓 💞 💝 💘 ❣️ 💟 🔥 💫 🌟 💥 💯 🎉 🎊 🎈 🎁 🏆 🥇 🥈 🥉 🏅 🎖
No comments yet

Be the first to share your thoughts!