
অচেনা এক হাওরে জলচর পাখির খোঁজে গত ৫ ফেব্রুয়ারি গেলাম সিলেটের কানাইঘাটে। হাওরটি ‘বড় হাওর’ নামে পরিচিত। সঙ্গে আছেন অশীতিপর দুই ‘চিরতরুণ’ পাখি গবেষক। একজন রেজা খান। ঢাকা থেকে সিলেটে এসে পৌঁছেছেন শেষ রাতে। সকালে হোটেলের নিচে দেখি রেজা স্যার সবার আগে হাজির। সঙ্গে সুইডিশ পাখিদেখিয়ে নিলসেন জান এরিখ। আমাদের দলের অন্যজন ইনাম আল হক। হাকালুকি হাওর থেকে আমরা সরাসরি এসেছি সিলেটে। সবাই মিলে এক গাড়িতে বড় হাওরের দিকে রওনা হলাম।
হাওরের প্রথম একটি বিলে ঢুকেই বেশ কিছু হাঁসপাখির দেখা পেলাম। মূলত সবই পরিযায়ী হাঁস। বেশির ভাগই ছিল মরচে রং ভুতিহাঁস। সঙ্গে ছিল কিছু তিন জাতের বগা, পানকৌড়ি ও জলপিপি। কদিন আগে এই বিলেই দেখা গেছে দুনিয়ার সবচেয়ে বিরল একটি হাঁসের দেখা। নাম তার বেয়ারের ভুতিহাঁস। এখন আর নেই। পানি কিছুটা কমে গেছে বলে মনে হাঁসটি অন্য কোথাও চলে গেছে।
ঘণ্টাখানেক পাখি দেখে সময় কাটল। তবে যে পাখির খোঁজে এসেছি, তার দেখা মিলল না। পাখিটির নাম পাতিসারস। উঁচু লম্বা শামুকখোলের চেয়ে বড়। এরিখ বললেন, তাঁর টেলিস্কোপ লাগালে চারপাশের যেকোনো জায়গায় এই পাখি থাকলে তা সহজেই বের করা যাবে। আরও আধা ঘণ্টা তন্ন তন্ন করেও হদিস পেলাম না। প্রায় এক সপ্তাহে আগে শামীম খান ও রেজা খান এই সারস পাখির দেখা পেয়েছেন এ হাওরে।
স্থানীয় পাখিদেখিয়ে বন্ধু শামীন খান আসার আগেই সাড়ে চার কিলোমিটার হেঁটেছি। কয়েকটি বিল ঘুরেছি। আরও অনেক পাখির দেখা পেলাম। একসঙ্গে ৭৯টি উত্তুরে টিটি দেখলাম। সঙ্গে পেলাম সাপ-পাখিসহ প্রায় ৫১ প্রজাতির ১ হাজার ৪০০ জলচর পাখি। কিন্তু সারসের দেখা পেলাম না।
ঘড়ির কাঁটায় প্রায় ১১টা বাজে। তখনই শামীম খান এলেন। এসেই বলেন, আপনারা ভুল দিকে ঘুরে সারসের খোঁজ করছেন। তাঁর কথামতো ঘুরলে আরও প্রায় ৩ কিলোমিটার হাঁটতে হবে। তারপর সারসের দেখা পাওয়া যেতে পারে। কথা না বাড়িয়ে হাঁটা ধরলাম। হাওরের শেষ প্রান্তে একটি ঘাসবন দেখা যাচ্ছে। বেশ কয়েক প্রজাতির ঘাসপাখি দেখলাম। এর মধ্যে বিরল চটকেরও একটি প্রজাতি ছিল। তখনো সারসের দেখা নেই। ক্লান্ত হয়ে রোদের ভেতরই ঘাসের ওপর বসে পড়লাম। কিন্তু ইনাম ভাই আর রেজা স্যার আর থামলেন না। প্রায় ২০ মিনিট হয়ে গেল। বন্ধু অনু বাইনো দিয়ে দুজনকে খুঁজছিলেন। তখনই তাঁর চিৎকার শুনতে পেলাম। সারসের দেখা মিলেছে ঠিক রেজা খান আর ইনাম ভাইয়ের মাথার ওপর। এরিখও মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। সোজা দৌড় শুরু করলাম। একদম পাখির কাছাকাছি গেলাম। ছবি ওঠালাম।
অসাধারণ এক পাখির দেখা পেলাম। পাখিটি বাংলাদেশে বিলুপ্তই বলা চলে। গত ৫০ বছরে দেখা গেছে মাত্র চারবার। এর মধ্যে দুই বছর ধরে দেখা যায় বড় হাওরে। সংখ্যায় মাত্র তিনটি। এই হাওরে শতাধিক মানুষ গেছেন তাদের ছবি তুলতে। আমরা যে আবাসস্থল দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে, পাখিটির জন্য প্রকৃত বিচরণস্থল। হয়তো নিয়মিতই এই পাখিগুলো শীতে এই এলাকায় আসে। কিন্তু আমাদের তা আগে জানা ছিল না।
বড় হাওর বিলে কখনো পাখিশুমারি হয়নি। এবারই আমরা প্রথম এ এলাকায় গেলাম পাখি জরিপ করতে। ঘাসবন এলাকায় মূলত গোচারণভূমি ও জলাশয়গুলো লিজ দেওয়া হয় স্থানীয় লোকজনকে। শীতে অনেক বিল শুকিয়ে মাছও ধরা হয়। এখানে পাখিবান্ধব পরিবেশ টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব স্থানীয় সরকার ও মানুষের। জলাশয় আর ঘাসবনগুলো যদি পাখিবান্ধব রাখা যায় তাহলে এলাকাটি একটি অসাধারণ পাখি এলাকায় পরিণত হবে।
সীমান্ত দীপু: বন্য প্রাণী গবেষক
Published: প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৭: ৪৯
Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/environment/lczihpuzpy
Comments Section
Comments
Processing your comment...
Share Your Thoughts
No comments yet
Be the first to share your thoughts!